আমাদের দেশে বত্সরের শুরু তথা জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন দেশের প্রতিটি স্কুলে উদযাপিত হয় পাঠ্যপুস্তক উত্সব। নূতন বইয়ের গন্ধ শুঁকিয়া ছাত্র-ছাত্রীরা আনন্দে হয় মাতাল। গত প্রায় এক দশক ধরে বর্তমান সরকার বেশ সাফল্যের সঙ্গে নববর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলিয়া দিতেছে বিপুলসংখ্যক বিনামূল্যের রঙিন প্রচ্ছদসম্বলিত ঝকঝকে চকচকে নূতন বই। এবারও তাহার ব্যত্যয় হইবে না। খবরে প্রকাশ, এবার ২৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে নূতন বই তুলিয়া দিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিনামূল্যের বই বিতরণের কার্যক্রম উদ্বোধন করিবেন। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক হইতে শুরু করিয়া মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে এইসব বই বিতরণ করা হইবে। তাহাদের মোট সংখ্যা চার কোটি ২৬ লক্ষ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন। মোট বইসংখ্যা ৩৫ কোটি ২১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৮৮২টি। আর ইহাতে খরচ হইতেছে প্রায় এক হাজার ৮২ কোটি টাকা। মূলত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ঝরিয়া পড়া রোধে এই উত্সবের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে ২০১০ সাল হইতে পালিত হইয়া আসিতেছে এই পাঠ্যপুস্তক উত্সব। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, প্রস্তুতকরণ, বিতরণ ও সময়মত সকল শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছাইয়া দেওয়া আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে সর্ববৃহত্ কার্যক্রম। পাঠ্যপুস্তক বিতরণের এই কার্যক্রম বিশ্বে অতুলনীয়। ইহা এই সরকারের একটি বড় সার্থকতা এবং আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি মাইলফলকও বটে। একই কারণে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত অর্জনের অন্যতম হিসাবেও ইহা পরিগণিত। এবার পাঠ্যপুস্তক উত্সবের দুইটি দিক একটু ব্যতিক্রম। প্রথমত এবার পরীক্ষামূলকভাবে ষষ্ঠ শ্রেণি হইতে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূরক কৃষিশিক্ষা নামে একটি নূতন বই দেওয়া হইতেছে। দ্বিতীয়ত হিজড়াদের নিয়া লেখা ‘বৈচিত্র্যময় মানুষ’ নামে আরেকটি সম্পূরক বই দেওয়া হইতেছে ষষ্ঠ শ্রেণির কিছু শিক্ষার্থীকে। সম্পূরক বইগুলি মূলত দেওয়া হইতেছে পরীক্ষামূলকভাবে। ইহা যেমন সব শিক্ষার্থী পাইবে না, তেমনি ইহার ওপর জাতীয়ভাবে কোনো পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হইবে না। আমরা প্রায়শ বলিয়া থাকি যে, আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের বাহিরেও বই পড়িতে ও জ্ঞান আহরণে উদ্বুদ্ধ করিতে হইবে। নূতন সম্পূরকমূলক বই সেই উদ্দেশ্য সাধনে কিছুটা হইলেও সহায়ক হইবে। এইজন্য এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
এইবার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রায় এক লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচটি ভাষায় (মারমা, চাকমা, গারো, সাদ্রি ও ত্রিপুরা) রচিত প্রায় পৌনে তিন লক্ষ বইও ছাপা হইতেছে। শুধু তাহাই নহে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও ব্রেইল পদ্ধতিতে ছাপা হইতেছে বই। তাহাছাড়া এইবার বইয়ের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন নাই। তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ডিসেম্বর মাস আসিলেই বিনামূল্যের বই যথাসময়ে দেওয়া যাইবে কিনা তাহা লইয়া পত্র-পত্রিকায় সংশয়মূলক নানা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এইবার এমন কোনো আশঙ্কা নাই বলিলেই চলে। এই ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান জানাইয়াছেন যে, চাহিদা অনুযায়ী মোটামুটি প্রায় সব বই মাঠপর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে। বাকি বইও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নির্ধারিত সময়েই পৌঁছাইয়া যাইবে। তবে আপত্কালীন মজুতসহ এখনো সোয়া দুই কোটি বই মাঠপর্যায়ে পাঠানোর যে কাজ বাকি রহিয়াছে, তাহার প্রতি গুরুত্ব দিতে হইবে। আমরা আশা করি, এইবার নূতন বইয়ে কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা তথ্য বিভ্রাট থাকিবে না এবং ছাপা, সেলাই ও বাঁধাই হইবে মানসম্মত।
