যন্ত্রকে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দিয়া কাজ করাইবার প্রযুক্তি দিন দিন ব্যাপক উন্নতিসাধন করিতেছে। তবে প্রশ্ন উঠিয়াছে যে, যন্ত্র যদি মানুষের মতো নিজে নিজে চিন্তাভাবনা করিতে শেখে এবং সেই অনুযায়ী নিজেই কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে তাহা নানা দিক হইতে মানুষের জন্য আত্মঘাতী হইবে না তো? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষ কাজ হারাইবে—ইহা এখন প্রতিষ্ঠিত। সম্প্রতি গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই স্বীকার করিয়াছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লইয়া ভয় অমূলক নহে। উল্লেখ্য যে, যেইসকল সংস্থা বিশ্বব্যাপী আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স লইয়া ব্যবসা করিতেছে, তাহাদের মধ্যে গুগল অন্যতম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লইয়া গত বত্সর পূর্বে বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতিঃপদার্থবিদ স্টিফেন হকিং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছিলেন। মানবসভ্যতার ধ্বংসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের ভূমিকা থাকিবে বলিয়া মনে করিতেন তিনি। হকিং আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্ভবত একদিন মানুষের স্থলাভিষিক্ত হইবে। মানুষ যেমন কম্পিউটার ভাইরাস তৈরি করিয়াছে, কেহ হয়তো এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করিবে—যাহা নিজে নিজেই বৃদ্ধি পাইবে। তিনি মনে করিতেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয় মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার, নয়তো সবচাইতে খারাপ।
যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লইয়া যত ধরনের উদ্বেগ রহিয়াছে, তাহার জবাব দেওয়া সহজ নহে। কারণ প্রযুক্তিকে যদি যথাযথ ব্যবহার করা যায়, তাহা হইলে মানুষের এমন উপকার হইবে যাহা হয়তো এখনো কল্পনাই করা যাইতেছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম ধারণা পাওয়া যায় ১৯২০ সালে, লেখক কারেল ক্যাপেকের ‘রুশম্স ইউনিভার্সেল রোবটস’ নামে একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি হইতে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স লইয়া গবেষণা শুরু হয়। কম্পিউটার নব নব উন্নতির পর ইহা বাস্তবরূপ পায় এবং ক্রমশ তাহা দুরন্ত গতিতে বিকশিত হইতে থাকে। ইহা ঠিক যে, কোনো অতিউন্নত প্রযুক্তি যখন প্রথম আসে, তাহার উপর তখন নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ হয় না। এমনকী সমর-বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, এখন ইহাকে আপাতভাবে নিরীহ বলিয়া মনে হইলেও ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই প্রযুক্তি আর সামরিক খাতে সবচাইতে বেশি প্রভাব রাখিবে। অনেকে ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন যে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া ঢুকিয়া পড়া যাইবে মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে। রাষ্ট্র সহজেই নাগরিকদের ওপর নজরদারি করিতে পারিবে। এমনকী খুব সহজে লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে ছড়াইয়া দেওয়া সম্ভব হইবে ভয়ঙ্কর কোনো গুজব। কেহ কেহ এই কারণে মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনে পরমাণু অস্ত্রের চাইতেও ভয়ঙ্কর হইয়া দাঁড়াইতে পারে। উন্নত দেশের সামরিক বাহিনী এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করিতে পারে যাহাতে মানুষ খুন করিতে কাহারো নির্দেশ লাগিবে না। আবার মানবকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিপ্লব সাধন করিতে পারে। স্পষ্টতই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হইবে নাকি সর্বনিকৃষ্ট—তাহা নির্ভর করিবে ইহার প্রয়োগের উপর।
