ধানমন্ডিতে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতির হত্যাকাণ্ডের পর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে এ হত্যার সঙ্গে নতুন গৃহকর্মীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ফুটেজ অনুযায়ী, শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঐ নারী কাজের বুয়ার বেশে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন গৃহকর্ত্রীর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার বাচ্চু। আধাঘণ্টা পর বাচ্চু নতুন গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়িতে করে পঞ্চম তলার ফ্ল্যাট থেকে চতুর্থ তলার আফরোজা বেগমের ফ্ল্যাটে ঢোকেন। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে বাচ্চু চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যান। বিকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঐ নতুন গৃহকর্মী ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তৃতীয় তলায় নামেন। এরপর তিনি লিফটে ওঠেন। লিফটের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় ঐ নারীর দুই পায়ের স্যান্ডেলে রক্ত লেগে থাকতে দেখা যায়। ঐ নারী লিফটে করে নিচে নেমে যায়।
শনিবার সন্ধ্যায় আফরোজা বেগমের বড়ো মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবা বাদী হয়ে অজ্ঞাত গৃহকর্মীসহ সাত-আট জনকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। চাঞ্চল্যকর এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি মাঠে নেমেছে।
গতকাল অ্যাপার্টমেন্টের চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা যায়, বাসার ভেতরে যে কক্ষ থেকে কাজের বুয়া দিতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে সেখানকার রক্ত পরিষ্কার করা হয়নি। কক্ষটি খুলতেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। রক্তে মাছি ভন ভন করছিল।
সেই রুম দেখিয়ে দিয়ে নিহত আফরোজা বেগমের ছোটো মেয়ের স্বামী শিল্পপতি মনির হোসেন তারিম বলেন, দেখেন রক্তের মধ্যেই ঝাড়ু পড়ে আছে। তার মানে মেয়েটি হয়তো ঝাড়ু দিচ্ছিল, ঐ সময় তাকে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তারপর তার শাশুড়ির রুমে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে যে আম্মা (আফরোজা বেগম) হয়তো খাটের ওপর শোয়া বা বসে ছিলেন। ঐ অবস্থায় তাকে ছুরি দিয়ে গলায় আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে দুই-তিন ফুট দূরে গিয়ে পড়েছে। এরপর তাকে আরো আঘাত করে হত্যা নিশ্চিত করায় টেনে-হেঁচড়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে রাখা হয়। তাকে হত্যার পর তার (আফরোজা বেগম) হাত থেকে স্বর্ণের বালা, কানের দুল ও হাতের আংটি খুলে নিয়ে গেছে। হত্যার এক-দুই দিন আগে তার শাশুড়ি ব্যাংক থেকে দেড় লাখ টাকা তুলে রেখেছিলেন আলমারিতে। তাছাড়া আগে থেকেই আরো টাকা এবং বেশকিছু স্বর্ণালংকারও ছিল সেই রুমের ড্রয়িংরুমে। সেসব কিছু তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
মনির হোসেন আরো বলেন, যে বাচ্চুর মাধ্যমে এই কাজের বুয়া এসেছিল, সেই বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সঙ্গে থাকে। বাচ্চুই এ কাজের মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনার দিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মেয়েটিকে নিয়ে বাচ্চু পাঁচতলায় আমাদের ফ্ল্যাটে আসে। দরজা খোলা অবস্থায় বাইরে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে কিছু কথা বলা হয়। তারপর বাচ্চুর সঙ্গে মেয়েটিকে চতুর্থ তলায় পাঠানো হয়। যাতে সে বাসা ও বাসার কাজ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে সেজেন্য পাঠানো হয়। কিছুক্ষণ পর আম্মা যান নিচতলায়। কিছু সময় পর আমার স্ত্রী (দিলরুবা সুলতানা) ফোন করেন। কিছুক্ষণ কথা বলেন। তারপর আবার পাঁচ মিনিট পর ফোন করলে তা বন্ধ পেয়ে ছোটো কাজের ছেলে রিয়াজকে পাঠানো হয়। সে নিচে গিয়ে দেখতে পায়, তাদের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে।
ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পেরেছে বুয়াবেশী ঐ তরুণী ৬টা ১০ মিনিটে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার সময় তার পায়ে রক্তের দাগ ছিল। এছাড়া বাইরের রাস্তা থেকে রক্তমাখা একটি জুতা উদ্ধার করেছে সিআইডি। সেই জুতা পালিয়ে যাওয়া ঐ তরুণীর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বজনরা জানান, তরুণী একা ছিল না। তার আশেপাশে আরো অনেকেই ছিল। কারণ তিনি যখন ৩টার দিকে বাসায় ঢোকেন, তখন তার বাসার সামনে রাস্তার বিদ্যুতের খুঁটিতে হেলান দিয়ে একাধিক তরুণীকে দেখেছেন। তাদের সঙ্গে কোনো গাড়ি ছিল, যেটির সহায়তায় মেয়েটি পালিয়ে গেছে।
পুলিশের ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফি বলেন, আমরা সম্ভাব্য সকল কারণকে সামনে রেখে তদন্ত করে যাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে কাজের বুয়াকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একজন নারী ছুরি দিয়ে জবাই করে দুই নারীকে হত্যা করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ হত্যার সঙ্গে ঐ নতুন গৃহকর্মীর সঙ্গে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা—তা ঐ নারীকে আটক করা হলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এছাড়া মনিরের ব্যক্তিগত সহকারী (কেয়ারটেকার) বাচ্চুসহ বাড়ির তিন সিকিউরিটি গার্ড ও এক ক্লিনারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাচ্চু দাবি করেছেন, তিনি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এক পান দোকানদারের মাধ্যমে ঐ তরুণীকে কাজের বুয়া হিসেবে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিও তাকে চেনেন না বলে দাবি করেছেন।
ধানমন্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘মেয়েটির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তার স্থায়ী ঠিকানা বের করা হয়েছে। সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পর সে বাড়িতে যায়নি। রাজধানীর কোথাও আত্মগোপন করে আছে। আশা করছি খুব শিগিগরই তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে’।
