অসীম চন্দ্র বনিক
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারে বাস করে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ (বিবিএস)। বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপ, প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা, বিপন্ন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার উন্নয়নেও প্রতিবন্ধক হিসেবে বিদ্যমান। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি নানা সংস্কারমুক্ত হলেও এখনো এটি সুপ্রশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরির জন্য যথোপযুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে আমাদের বিপুল জনসংখ্যা জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি। আমাদের জনসংখ্যার মূল অংশ যুব সম্প্রদায়। যেখানে শ্রম শক্তিতে পরিণত হয়ে জাতীয় উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, সেখানে তারা জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ শ্রম শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। আর এটা শুরু করতে হবে একেবারেই প্রাথমিক স্তর থেকে। তাহলেই গড়ে উঠবে টেকসই উন্নয়নের সহায়ক দক্ষ জনশক্তি।
কারিগরি শিক্ষা হচ্ছে এমন এক ধরনের শিক্ষা যেখানে শিক্ষার্থী তার জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো একটি পেশা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারে। সাধারণ শিক্ষায় অনুত্সাহী শিক্ষার্থীরা মনের মতো বিষয়ে কারিগরি শিক্ষায় অনুশীলন করে নানাভাবে সাফল্যের পরিচয় দিতে পারে। এ ধরনের শিক্ষার প্রধান শর্ত পরিশ্রম, একাগ্রতা ও যথার্থ অনুশীলন। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই কম মেধাবী শিক্ষার্থীকেও জাতির জন্য প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। খুব স্বল্প পরিসরে আমাদের দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা মাধ্যমিক শিক্ষার পরবর্তী স্তরে কার্যকর আছে। শিক্ষার্থীর হার বাড়াতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা শিরোনামে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে বলা হয়েছে—প্রাথমিক স্তরের শেষ তিন শ্রেণিতে অর্থাত্ ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জীবন পরিবেশের উপযোগী প্রাক-বৃত্তিমূলক এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা প্রদান করা হবে, যাতে তারা কোনো কারণে আর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলে এ শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে—একবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে হবে। যাতে তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে। আমি মনে করি, সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জীবন পরিবেশের উপযোগী প্রাক-বৃত্তিমূলক এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।
বর্তমান বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮৬ শতাংশ, মাথাপিছু আয় ১৭৫১ ডলার, সাক্ষরতার হার ৭২.৭৬%। জিডিপির অংশ দুই অঙ্কে প্রবেশ করাতে হলে কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কারণ বৃত্তিমূলক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের বোঝা নয়, দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের উপায়। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পদার্পণ—এসব লক্ষ্য অর্জন করতে প্রাক বৃত্তিমূলক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর উল্লেখযোগ্য দিক হলো—ধর্ম, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এতে মানুষের স্বভাবজাত অনুভূতিকে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি পার্থিব জগতে জীবন-জীবিকার সুযোগ সৃষ্টিকারী শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে, যা কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচিত করবে।’
মৌলভীবাজার
