আজহার মাহমুদ
ছুটির দিন। কার না মন চায় বেড়াতে? তাই বন্ধুরা ঠিক করলাম খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যাবো। যা ভাবা, সেই কাজ। সকলে মিলে গাড়ি ঠিক করলাম। চট্টগ্রামের একেখান থেকে নোয়াখালীগামী একটি বাসে উঠলাম। ১ ঘণ্টার আগেই আমরা পৌঁছালাম খৈয়াছড়া যাওয়ার মূল রাস্তায়। এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে পূর্বদিকে। মূল সড়ক থেকে পূর্বদিকে অনেক পথ যেতে হবে। রাস্তার পাশেই কিছু সিএনজি আছে। তারা অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত যায়। প্রতিজন ভাড়া ১৫ টাকা। আমরাও অর্ধেক পথ গাড়িতে গেলাম। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি কিছু লোক ছোট ছোট বাঁশ বিক্রি করছে। যারাই ঝরনার দিকে যাচ্ছে সকলের হাতেই বাঁশ। আমরাও ৫ টাকা দিয়ে কিনে নিলাম বাঁশ। এই বাঁশ ছাড়া আপনি হাঁটতে পারবেন না। যত ভেতরে যাবেন তত কর্দমাক্ত মাটি। সেইসঙ্গে ঝরনার পানির স্রোত। সব মিলিয়ে আপনার ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই খৈয়াছড়া যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই হাতে একটা করে শক্ত লাটি কিংবা বাঁশ নিয়ে যেতে হবে।
আমরাও একইভাবে এগুচ্ছি। যেখানে গাড়ি নামিয়ে দিয়েছে সেখান থেকে খাবারের হোটেল পর্যন্ত পৌঁছাতে আরো ৫ মিনিট হাঁটতে হবে। এরপর এসব হোটেলে দুপুরের খাবার অর্ডার করে যেতে হয়। মোবাইল, ব্যাগ সবকিছু হোটেলের লকারে জমা রেখে যেতে পারবেন। আমরাও তাই করেছি। এরপর শুরু হলো মূলপর্ব। হোটেলের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম এখান থেকে ঝরনার কাছাকাছি যেতে কতক্ষণ লাগবে? ওনারা বললেন, দ্রুত গেলে আধঘণ্টা লাগবে। এরপর আমরাও দ্রুত ছুটতে লাগলাম। যত যাচ্ছি তত কঠিন পথ। কোথাও ঝরনার পানি, কোথায় হাঁটু অবধি কাঁদা। অনেকে আবার পিচ্ছিল কাদায় স্লিপ খেয়ে পড়ে গেছে। খুব সর্তকভাবে পা দিতে হয়। পাহাড়ের মাটিগুলো এত শক্ত যে, মনে হচ্ছে পাথর। যেতে যেত কখনো ঝরনার পানির স্রোত দেখে মন জুড়ায়, কখনো পাহাড়ের কঠিন পথ দেখে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি। মজার বিষয় হচ্ছে, যাওয়ার পথে আমরা অনেকগুলো পাখি আর বানর দেখি। এত সুন্দর বানরগুলোকে দেখে ভীষণ আনন্দ লাগবে যে কারো। চিড়িয়াখানার বানর আর খোলা বনের বানর দেখার মধ্যেও তফাত্ আছে। এভাবে এক সময় চলে গেলাম প্রথম ঝরনায়। ওহ! আপনাদের তো বলাই হয়নি। এখানে অনেকগুলো ঝরনা রয়েছে। বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন মত পেয়েছি। কেউ বলে ৭টা, আবার কেউ বলে ১১টা ঝরনা রয়েছে। তবে প্রথম ঝরনাটা নিচে বলে একটু কষ্ট করলে তা দেখা যায়। এরপরের ঝরনাগুলো দেখতে হলে অনেকটা ঝুঁকি নিতে হবে। কারণ দ্বিতীয় ঝরনা থেকে সবগুলো পাহাড়ের ওপর। যত উঁচুতে যাবেন তত ঝরনা। বৃষ্টির দিন সবকিছু পিচ্ছিল থাকে। প্রথম ঝরনায় অনেক মানুষ থাকে। কারণ এখানেই আসে বেশিরভাগ মানুষ। পর্যটকদের ৯৫ শতাংশ এখান থেকেই তৃপ্তি নিয়ে ফিরে যান। তবে প্রথম ঝরনাটা দেখতে বেশ। আকারেও বড়। ঝরনার পানির গতিও অনেক। বেশ উত্সব উত্সব মনে হলো। আমরা একসঙ্গে এসেছি ১০ জন। যার মধ্যে ৪ জন সিদ্ধান্ত নিলাম বাকি ঝরনাগুলো দেখবো। অন্যরা সাহস করতে পারছে না। কয়েকজন পাহাড়ের অর্ধেক উঠে আবার ফেরত গিয়েছে।
যাই হোক, আমাদের খৈয়াছড়া ঝরনার মূল ট্র্যাকিং শুরু করতে হলো। পাহাড়ের গাছগুলোর সঙ্গে মোটা মোটা রশি বাঁধা রয়েছে। রশিগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল অনেক পুরোনো। নিচ থেকে সেই রশিগুলো ধরে ধরে উঠতে লাগলাম ওপরে। একটু পথ উঠে দেখি আর রশি নেই। এরপর বাঁশ আর গাছ ধরে ধরে উঠতে লাগলাম। উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে গেলাম। মাঝপথে একটু জিরিয়ে নিলাম। মানুষের হাঁটার চিহ্ন দেখে বুঝতে পারলাম ঝরনা আশেপাশেই আছে। একটু পর ঝরনার পানির শব্দ। খুশিতে লাফাচ্ছি। ঝরনার কাছে গেলাম। পানিতে ভিজলাম। প্রকৃতিটাও বেশ সুন্দর। পাহাড়ের অনেক ওপরে। এখানেও দেখলাম ৫/৬ জন ছেলে। ওরা এসেছে কুমিল্লা থেকে। ওদের জিজ্ঞেস করলাম, এটা কয় নম্বর ঝরনা? ওরা বললো, ৫ নম্বর। আমরা তখন অবাক। তাহলে বাকিগুলো কী ফেলে এলাম! এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আর ওপরে যাবো না। নিচে নেমে পরের ঝরনাগুলো উপভোগ করে বাড়ি ফিরবো। নিচে নেমে পেলাম চতুর্থ ঝরনা। এখানে অনেকটা সময় ছবি তুললাম। তবে চারপাশে বেশ অন্ধকার। একা থাকলে যে কেউ ভয় পাবে দিনের বেলায়ও।
চতুর্থ ঝরনা থেকে তৃতীয় ঝরনায় নামতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। নামার অবস্থা নেই বললেই চলে। আর পাহাড়ের মাটিগুলো মাটি না বলে পাথর ভললেও ভুল হবে না। খুব কষ্টে তৃতীয় ঝরনায় এলাম। এখানকার প্রকৃতি উপভোগ করলাম। তবে এ ঝরনার পানিগুলো বেশ ঠাণ্ডা। চারপাশের দৃশ্য ছিল অসাধারণ। পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো শহরটা কত সুন্দর লাগছে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। এরপর নিচে নামতেই পেলাম দ্বিতীয় ঝরনা। দেখেই মন জুড়ালো। দ্বিতীয় ঝরনায় বেশ কয়েকটি ছবি তুলে নেমে এলাম সেই প্রথম ঝরনায়। যেখানে সবাই রয়েছে। নিচে নেমে ভাবছি, সৃষ্টিকর্তার কী সুন্দর সৃষ্টি। কী অদ্ভুত! আমাদের চারপাশে কত সুন্দর স্থান রয়েছে। আমরা চাইলেও যা উপভোগ করতে পারি না। এরপর সবাই মিলে হোটেলে এলাম। বিকেল ৫টায় আমরা দুপুরের খাবার খেতে বসলাম। খাওয়া শেষ করে আবার সেই আগের কায়দায় বাড়ি ফিরে এলাম।
কীভাবে যাবেন
চট্টগ্রাম শহরের একেখান থেকে ঢাকা, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন বাসে ৫০ থেকে ৮০ টাকা ভাড়ায় খৈয়াছড়া স্ট্যান্ডে নামতে হবে। গাড়ির হেলপারকে বললেই নামিয়ে দেবে। একইভাবে ঢাকার যেকোনো বাস কাউন্টার থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠতে হবে। যাওয়ার পথে ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে চট্টগ্রামের মিরসরাই পার হয়ে বড়তাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে নামতে হবে। ওখানে নেমে স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞেস করলেই তারা বলে দেবে কোন পথে যেতে হবে। লোকজন যে রাস্ত দেখিয়ে দেবে সেই রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিগুলোতে ১৫ টাকা দিয়ে অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত যাওয়া যাবে। বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে। ঝরনায় যাওয়ার রাস্তা একটিই। পথে আরো অনেক অ্যাডভেঞ্চারপিপাসুদের দেখা পাবেন।
কোথায় থাকবেন
বড়তাকিয়া বাজারে থাকার কোন হোটেল নেই। কিন্তু আপনি চাইলে চেয়ারম্যানের বাংলোয় উঠতে পারেন। এছাড়া মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে আপনি থাকার জন্য বেশ কিছু স্থানীয় হোটেল পাবেন। মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে খাওয়ার জন্য অনেক রেস্টুরেন্টও পাবেন। অথবা আপনি চট্টগ্রাম শহরে চলে আসতে পারেন। বড়তাকিয়া বাজর থেকে গাড়িযোগে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করলে থাকার অনেক ভালো মানের হোটেল রয়েছে। তাছাড়া অনেক নামীদামী রেস্তারাও রয়েছে খাওয়ার জন্য।
