সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ
পঞ্চগড়
ভারতের দার্জিলিং বা নেপাল নয়, বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা থেকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতমালা কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব রূপ দেখা যাচ্ছে। গত দু-তিনদিন ধরে তেঁতুলিয়া থেকে সকাল-বিকেল স্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। ভোরের আকাশে বরফ আচ্ছ্বাদিত নয়নাভিরাম কাঞ্চনজঙ্ঘার নৈসর্গিক রূপ। তেঁতুলিয়ায় মেঘ আর কুয়াশা মুক্ত উত্তর-পশ্চিম আকাশে তাকালেই দেখা মিলবে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার দূরের এই কাঞ্চনজঙ্ঘা। দেখলে মনে হবে চোখের সামনেই সাদা পাহাড়।
গত বৃহস্পতিবার সকালে সূর্য ওঠার পর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। সূর্য কিরণের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই দেখা যায়। তারপর ক্রমান্বয়ে ঝাঁপসা হয়ে যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে শেষ বিকেলে সূর্য কিরণ যখন তির্যক হয়ে বরফের পাহাড়ে পড়ে তখন অনিন্দ্য সুন্দর হয়ে ধরা দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘা।
কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্চ এই চূড়া দেখতে সামর্থ্যবানরা ছোটেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহরের টাইগার হিল। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলই কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখার সবচেয়ে আদর্শ জায়গা। কেউ কেউ যান সান্দাকপু বা ফালুট। আবার কেউ কেউ সরাসরি নেপালে গিয়ে দেখে থাকেন।
অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শীতের মেঘ মুক্ত নীলাকাশে ভেসে ওঠে তুষার শুভ্র হিমালয় পর্বত ও কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখের কাছে ভেসে থাকা হিমালয় পর্বত ও কাঞ্চনজঙ্ঘার দুর্লভ মায়াবী দৃশ্য দেখে অনেকেই মুগ্ধ হচ্ছেন। এরইমধ্যে পর্যটকরা আসা শুরু করেছেন।
বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যোদয়ের সময় দিনের প্রথম সূর্য কিরণের ঝিঁকিমিকি পাসপোর্ট আর ভিসা ছাড়াই ভ্রমণপিপাসুরা প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসতে শুরু করেছেন তেঁতুলিয়ায়। ভোরে ঊষার সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর রোদ পড়ে সেই রোদ যেন ঠিকরে পড়ে পর্যটকের চোখে।
হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘার নানারূপ দেখা যাচ্ছে। একই অঙ্গে অনেক রূপ এই কাঞ্চনজঙ্ঘার। প্রথমে কালচে, এরপর ক্রমান্বয়ে টুকটুকে লাল, কমলা, হলুদ ও সাদা রঙ্গ ধারণ করে। দূরবীন বা বাইনোকুলারের প্রয়োজন নেই। উত্তরের আকাশে নয়নাভিরাম হিমালয় মূলত বরফে ঢাকা সাদা মেঘের মতোই। সেইসঙ্গে রয়েছে পিরামিডের মতো কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া। এই তেঁতুলিয়া থেকেই পাসপোর্ট ভিসাহীন বা সহায় সম্বলহীন পর্যটকদের খালি চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপালি বিচ্ছুরণ দেখার উপহার দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা বলছেন অনেকেই।
জানা গেছে, দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন থেকে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬১ কিলোমিটার। এভারেস্ট শৃঙ্গের দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার, ভুটানের দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটার, চীনের দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিংয়ের দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটার, শিলিগুঁড়ির দূরত্ব ৮ কিলোমিটার আর কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। এছাড়া বাংলাবান্ধায় ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু হওয়ায় এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে।
জানা গেছে, কাঞ্চনজঙ্ঘা নেপাল ও সিকিমের সীমান্তে অবস্থিত। পৃথিবীর উচ্চতার দিক থেকে প্রথমসারির যে ৩টি পর্বত হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত সেই পর্বতমালায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে মাউন্ট এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গের উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার বা ২৯ হাজার ২৯ ফুট। আর পর্বত কেটু’র উচ্চতা ৮ হাজার ৬১১ মিটার বা ২৮ হাজার ২৫১ ফুট উচ্চতায় ২য় এবং ৩য় অবস্থানে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার বা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। হিমালয় পর্বতের এই অংশটিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমল বলা হয়ে থাকে। এর পশ্চিমে তামুর নদী, উত্তরে লহনাক চু নদী ও জংসং লা শৃঙ্গ এবং পূর্বদিকে তিস্তা নদী অবস্থিত।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় কিংবা তেঁতুলিয়া অথবা বাংলাবান্ধায় সরাসরি দূরপাল্লার কোচ যাতায়াত করে। এসব যানবাহনে চড়ে আপনি সহজেই তেঁতুলিয়ায় যেতে পারেন। এছাড়া ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর পর্যন্ত আসতে পারেন। সৈয়দপুর থেকে বাস, মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট কারে করে যেতে পারেন তেঁতুলিয়া বাংলাবান্ধা পর্যন্ত। যাত্রাপথে সময় ব্যয় হবে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। খরচ পড়বে জনপ্রতি ৫০০-১৫০০ টাকা। ট্রেনেও সরাসরি যাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা বা দ্রুতযান এক্সপ্রেসে যেতে পারেন পঞ্চগড়। পঞ্চগড় থেকে বাস, মাইক্রোবাস, কার বা যেকোনো যানবাহনে তেঁতুলিয়া উপজেলায় যেতে পারবেন। তেঁতুলিয়া যাওয়ার পথেই মাগুরমারী চৌরাস্তা নামক এলাকা থেকে তেঁতুলিয়া বা বাংলাবান্ধা পর্যন্ত গিয়ে দেখতে পারবেন কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য।
কোথায় থাকবেন, কী খাবেন
রাতযাপনের জন্য তেঁতুলিয়ায় সরকারি ৩টি ডাকবাংলোর পাশাপাশি কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। ডাকবাংলোগুলোতে অবস্থান করতে হলে আপনাকে আগেই উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো থেকেই দেখতে পারবেন অপরূপ দৃশ্য, দার্জিলিং, শিলিগুঁড়ি, হিমালয় এভারেস্ট কিংবা কাঞ্চনজঙ্ঘা। তেঁতুলিয়ায় ডাকবাংলো বা হোটেল না পেলে আপনাকে পঞ্চগড়ে গিয়ে থাকতে হবে।
আলোকচিত্র :ফিরোজ আল সাবাহ
