শিফারুল শেখ
১৯২৩ সালের পর ব্রিটেনে ডিসেম্বর মাসে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সিদ্ধান্তে এমপিরা সমর্থন দেওয়ায় ১২ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে চতুর্থবারের মতো ভোট দেবেন ব্রিটিশরা। ক্রিসমাসের আগে নির্বাচনে জিতে কোনো দল ‘ব্রেক্সমাস’ করতে পারবেন কি না সেটা নিয়েই আলোচনা চলছে।
n কেন এই নির্বাচন?
২০১৭ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে স্ন্যাপ নির্বাচন দিয়েও হাউজ অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। ব্রিটেনে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এর ফলে তিন বার ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে পাশ করাতে ব্যর্থ হন থেরেসা মে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও তার ব্রেক্সিট কৌশল নিয়ে পার্লামেন্টে দফায় দফায় পরাজিত হন। ২০২২ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস বলেন, ব্রেক্সিট নিয়ে অচলাবস্থা কাটাতে নতুন নির্বাচনের বিকল্প নেই। এ নিয়ে তিন বার তিনি পার্লামেন্টে হারেন। কিন্তু চতুর্থ বারে বিরোধী লেবার পার্টি তাকে সমর্থন দেয়। ফলে ফিক্সড টার্ম পার্লামেন্টস অ্যাক্ট-২০১১ সংশোধিত হয়।
n কীভাবে কাজ করবে?
ব্রিটেনে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন না। তারা আসনে এমপিকে ভোট দিয়ে পরোক্ষভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন। ৬৫০ আসনের পার্লামেন্টে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান সেই দলের প্রধানই প্রধানমন্ত্রী হন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৩২৬ আসন দরকার। কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ছোটো দলের সহায়তা নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে পারে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লিবারেল ডেমোক্র্যাটস এবং ২০১৭ সাল থেকে কনজারভেটিভ দলের জন্য সহায়তা দিয়ে আসছিল।
n কে জিততে যাচ্ছে?
বিভিন্ন মতামত জরিপে বরিসের দল এগিয়ে আছে। তবে থেরেসা মেও ২০১৭ সালে এ রকম এগিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিতলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। কারণ লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন একজন ভালো প্রচারক হিসেবে খ্যাত। এবারও যদি আসনের ক্ষেত্রে দুই দল সমানে সমান হন তাহলে লেবার পার্টি জোট সরকার গঠনে এগিয়ে যাবেন। দুই দলের কেউ যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় তাহলে সুযোগ নিতে পারে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দল। তারা ২০টি আসনে জিতলে তাদের ব্রেক্সিটবিরোধী অবস্থান কাজে লাগাতে পারবে। আবার নাইজেল ফারাজের ব্রেক্সিট পার্টিও কনজারভেটিভ পার্টির হারার সুযোগ নিতে চান। স্কটল্যান্ডের স্কটিশ পার্টি তার ৩৫ এমপি ধরে রাখতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনে ঠান্ডা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ভোটের হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
n নির্বাচনী ইস্যু
নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান ইস্যু যে ব্রেক্সিট তা সহজেই অনুমেয়। এই বিষয়ে বিভিন্ন দল বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। বরিসের দল এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রেক্সিট চুক্তি করেছে। তারা সেটা নিয়েই প্রচারণা চালাবেন। আর লেবার পার্টি সফট ব্রেক্সিটকে সমর্থন করে। দলটি দ্বিতীয় গণভোটের কথাও বলছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস ব্রেক্সিট বাতিল চায়। ব্রেক্সিট পার্টি চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে। লেবার পার্টি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিও আলোচনায় আছে। এছাড়া টিউশন ফি, ব্রিটিশ রেলওয়ে, পানি এবং জ্বালানি কোম্পানির জাতীয়করণ এবং উচ্চ আয়ের নাগরিকদের ওপর উচ্চহারে করারোপ প্রচারণার ইস্যু হবে।
n অচলাবস্থার নিরসন হবে?
ব্রিটেনের রাজনৈতিক আবহাওয়া ভালো নয়। নির্দিষ্ট কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দেশটিতে ছোটো দলগুলোর উত্থান ঘটছে। এর ফলে আগের চেয়ে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আশঙ্কাও বাড়ছে। এই নির্বাচনের ফলও যদি ২০১০ এবং ২০১৭ সালের মতো হয় অর্থাত্ কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় তাহলে ব্রেক্সিট বিভিন্ন দিকে চলে যাবে। এর ফলে ব্রিটিশ রাজনীতি আরো বড়ো ধরনের অচলাবস্থার দিকে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বরিসকে আবারও ব্রেক্সিট চুক্তি কার্যকরের জন্য পার্লামেন্টের সহায়তা নিতে হবে। তবে সফলতার নিশ্চয়তা নেই। আবার ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হলে আবার সাধারণ নির্বাচন হতে পারে। লেবার পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দ্বিতীয় গণভোট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর কনজারভেটিভ দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে পার্লামেন্টে পাশ হবে। তবে সেটাই শেষ নয়। ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা করতে হবে নতুন সরকারকে।
