গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে রূপায়িত হবে সমাজতান্ত্রিক নীতি এবং সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাব সমবায়ের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে—এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমুখী সমবায় আন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা সমবায়ের পথ—সমাজতন্ত্রের পথ, গণতন্ত্রের পথ। সমবায়ের মাধ্যমে গরিব কৃষকরা যৌথভাবে উত্পাদনযন্ত্রের মালিকানা লাভ করবে। অন্যদিকে অধিকতর উত্পাদন বৃদ্ধি ও সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষুদ্র চাষি গণতান্ত্রিক অংশ ও অধিকার পাবে। জোতদার ধনী চাষির শোষণ থেকে তারা মুক্তি লাভ করবে সমবায়ের সংহত শক্তির দ্বারা। সমবায়ের মাধ্যমে গ্রামবাংলায় গড়ে উঠবে ক্ষুদ্র শিল্প, যার মালিক হবে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং ভূমিহীন নির্যাতিত দুঃখী মানুষ।’ উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পরে জাতির পিতার নির্দেশ অনুযায়ী সারাদেশে সমবায়ভিত্তিক নানান কার্যক্রম চালু হয়। গ্রামভিত্তিক কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষকদের উচ্চফলনশীল বীজ, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি এবং গভীর নলকূপ সরবরাহের ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। পাশাপাশি তার উত্সাহে জেলে, তাঁতি প্রভৃতি পেশাভিত্তিক সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে সমবায়ের নতুন যাত্রাপথ তৈরি হয়।
বঙ্গবন্ধুর আমলেই সমস্ত বড়ো শিল্প, ব্যাংক, পাটকল, চিনিকল, সুতাকল ইত্যাদি জাতীয়করণ করা হয়। জমির সর্বোচ্চ মালিকানার সীমা নির্ধারণ করে দেন তিনি। সমবায় পদ্ধতিতে গ্রামে গ্রামে, থানায়, বন্দরে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয় মেহনতি মানুষের যৌথ মালিকানা। এর ফলে কৃষকরা তাদের উত্পাদিত ফসলের বিনিময়ে পাবে ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকরা পাবে শ্রমের ফল—ভোগের ন্যায্য অধিকার। অর্থাত্ তার আমলে সমবায় আন্দোলন ছিল সাধারণ মানুষের যৌথ আন্দোলন। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। সে সময় সমবায় সংস্থাগুলোকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিচালনা-দায়িত্ব ন্যস্ত হয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর। সমবায়ের পুরোনো ব্যবস্থা বাতিল করে এমন একটি নতুন ও সুষম ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল। উপরন্তু শোষণ ও প্রতিক্রিয়াশীল কোটারি স্বার্থকে চিরদিনের জন্য নস্যাত্ করে দেবার প্রত্যয়ে ছিল দৃঢ়তা। সমবায় সংস্থার অবাধ বিকাশ ও সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে দুর্নীতির জগদ্দল পাথরকে সরাতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রশাসনব্যবস্থাকে দুর্নীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করে জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য ছিলেন বদ্ধপরিকর। লেখা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ভাষণে প্রস্তাব রেখেছিলেন, ‘গ্রামের প্রত্যেকটি কর্মঠ মানুষ বহুমুখী সমবায়ের সদস্য হবে। যার যার জমি সে-ই চাষ করবে, কিন্তু ফসল ভাগ হবে তিন ভাগে— কৃষক, সমবায় ও সরকার।’ এই গ্রামীণ সমবায়কে তিনি নতুন গ্রাম সরকার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাদের হাতেই উন্নয়ন বাজেটের অংশবিশেষ তুলে দেওয়া হবে, ওয়ার্কস প্রোগ্রামও থাকবে তাদের হাতে।
বঙ্গবন্ধু কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। এ কারণে কৃষিকার্যে জড়িত কৃষককুল উপকৃত ও উত্সাহিত হয়। তিনি গ্রাম্য সমাজভিত্তিক গরিব কৃষকদের সহযোগিতার জন্য সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রায় ২২ লাখের বেশি কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসন করেন তিনি। বাজেটে কৃষি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থাও ছিল। শোষিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে জারিকৃত ভূমিস্বত্ব আদেশে পরিবারপিছু সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা সিলিং আরোপিত হয়। যদিও সেই আদেশ বাস্তবায়ন করা ছিল কঠিন। আসলে ভূমি সংস্কারের বদলে সমবায়ভিত্তিক যৌথ চাষের যে প্রস্তাব তিনি করেন, তা ছিল অধিক বাস্তবসম্মত। বঙ্গবন্ধু শুধু যে যৌথ চাষাবাদের প্রস্তাব রাখেন তা-ই নয়, তিনি পুরো গ্রামকে একটি সমবায়ী ব্যবস্থাপনার অধীনে আনার কথা ভেবেছিলেন। এ কথার অর্থ, গ্রামের যাবতীয় সম্পদ—তার জমি, ফসল ও পানি-এর ব্যবস্থাপনায় থাকবে গ্রামের মানুষের যৌথ ভূমিকা। গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে যে বাড়তি আয় হবে, তার সুষম ব্যবহার ও বণ্টনের জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ‘গ্রাম তহবিলের’ কথা ভেবেছিলেন। এই তহবিলের আয় আসবে উত্পাদিত ফসলের একাংশ থেকে, বাকিটা আসবে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ থেকে। বঙ্গবন্ধুর এই সমবায়ী গ্রামের প্রস্তাবটি এখনো প্রাসঙ্গিক। কারণ গ্রামের ক্ষমতায়নের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে গ্রামকে একটি সমবায়ী ইউনিটে পরিবর্তিত করে তাকে গণপ্রশাসনের প্রথম স্তর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই সমবায়ী গ্রাম নিজেই যদি একটি তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিট হয়ে ওঠে, তাহলে কায়েমি স্বার্থপরদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তাছাড়া গ্রামের মানুষ এককাট্টা হলে দুষ্টলোকদের ঠেকানো কঠিন নয়।
বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শ ধারণ করেই শেখ হাসিনা সরকার গ্রামকে উন্নয়নের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ‘একটি খামার, একটি বাড়ি’র মতো প্রকল্প সার্বিক গ্রাম উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ গ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সম্পৃক্ত হয়েছে ‘সমবায় চেতনা’র সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে যে উন্নয়নের কার্যধারা এগিয়ে চলেছে সেখানে জাতীয় সমবায় দিবসের গুরুত্ব সকলেই অনুধাবন করতে সক্ষম। আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সমবায় দিবস বারবারই আমাদের অনুপ্রেরণার উত্স। সব মিলে আমরা বলতে পারি, সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম, অব্যাহত প্রশিক্ষণ ও সমবায় আন্দোলন-সম্পর্কিত গবেষণার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে সমবায় দিবসের তাত্পর্য। কারণ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন—‘সমবায়’ সত্যিকারের জনগণের প্রতিষ্ঠান।
n লেখক :অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

