১৯৭১ :বিজয়ের পূর্বক্ষণে

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৩২

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। চলছে মুক্তিসংগ্রাম। পাকিস্তানী বাহিনিকে তখন চারদিক থেকে একটু একটু করে ঘিরে ধরছে বাঙালি মুক্তিসেনার দল। ইয়াহিয়া খান এই সময় ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় এক জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। তখনই খবর পেলেন ভারতের নয়টি বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে পাকিস্তানী বিমান বাহিনী। দিল্লিতে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে ইন্দিরা গান্ধী দিল্লি ফিরে গেলেন খুব দ্রুত। শেষ রাত নাগাদ ভারতও পাকিস্তানের ঘাঁটিতে গোলাবর্ষণ শুরু করে, সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ভারত-পাকিস্তান। ভারতের উপর আক্রমণ করার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মিত্রদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বুকভরা আশা নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন ইয়াহিয়া খান। তার হিসাব অনুযায়ী ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ শুরু হয়ে গেলে এটি থামানোর জন্য হলেও কূটনৈতিক মহলে মার্কিন তত্পরতা শুরু হবে। তখন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। এমন আশা ছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের।

১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত আণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় মহাযুদ্ধের প্রায় কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে ঘিরে ঠিক একই রকম তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটার মত ভয়াবহ দুর্যোগ ঘনিয়ে এসেছিল। এমন একটি দুর্যোগ যে আসতে যাচ্ছে তা নিশ্চিত জেনে নিক্সন ও কিসিঞ্জার সেই পথে হেঁটেছিলেন পাকিস্তানকে চূড়ান্ত পরাজয় থেকে উদ্ধার করতে এবং পাকিস্তানের মিত্র চীনকে প্রভাবিত করতে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম মুহূর্তে কিসিঞ্জার-নিক্সন আশায় ছিলেন যে তাদের চীনা বন্ধুরা প্রতীকী অর্থে হলেও কোনো না কোনো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। চীনাদের কাছে তেমন পদক্ষেপের প্রস্তাব করে একটি পরিকল্পনা নিয়ে কিসিঞ্জার ও চীনা রাষ্ট্রদূতের মধ্যে নিউইয়র্কে একটি গোপন বৈঠকও হয়। কিন্তু চীন সে পথে যায়নি।

৪ ডিসেম্বরে তত্কালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সিদ্ধান্তে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি জরুরি বার্তা প্রেরণ করা হয়। যেখানে বলা হয়- ‘পাকিস্তানের সর্বশেষ আক্রমণের জবাব দিতে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর মিলিত ভূমিকা সফলতর হতে পারে, যদি এই দুটি দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।’

৪ ডিসেম্বর থেকেই মিত্রবাহিনী সম্মিলিত আক্রমণ শুরু করে। আর ৬ ডিসেম্বর ভুটানের এবং ৭ ডিসেম্বর ভারতের বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কেরও শুরু হয়। মিত্রবাহিনীর নিয়মতান্ত্রিক আক্রমণের পাশাপাশি বাঙালি গেরিলাদের অতর্কিত হামলায়ও পাকিস্তানি বাহিনী ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীনতা।

পাকিস্তানের নকশায় তেমন একটা ভুল ছিলো না। ডিসেম্বরের ৪ তারিখে ওয়াশিংটন স্পেশাল আ্যাাকশন গ্রুপ মিটিং অন ইন্দো-পাকিস্তান হস্টিলাইটিজ নামে বৈঠকে যুদ্ধবিরতির এবং সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব আনেন হেনরি কিসিঞ্জার এবং সেই প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে তোলার প্রস্তাব করেন। সেই সময় নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার প্রতিনিধি আরেক দক্ষ কূটনীতিক জর্জ বুশ। তিনি প্রস্তাব দিলেন,‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্যদের নিজ নিজ সীমান্তের ভিতরে ফিরিয়ে নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে ক্ষমতা দেওয়া হোক।’ মার্কিন প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে ভেটো দেয়। মূলত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর দীর্ঘদিন ধরে করে আসা নির্যাতন, পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের পরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে শরণার্থী হিসেবে যাওয়ায় ভারতের ক্ষতির ব্যাপারটি বিবেচনা না করেই এই প্রস্তাব কোনোভাবেই গৃহীত হতে পারে না এই যুক্তিতেই মার্কিন প্রস্তাবে ভেটোর তালা ঝুলিয়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ব্রিটেন আর ফ্রান্স অনেকটা নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা যে ফন্দি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তা অনেকটা ভেস্তে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে। আর তাই সোভিয়েত প্রশাসনকে চাপে ফেলার উপায় খুঁজতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট নিক্সন সোভিয়েত নেতা  ব্রেজনেভকে জরুরি বার্তা পাঠান। বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ভারতকে সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় না করে তবে মস্কোতে প্রস্তাবিত সোভিয়েত-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।’

বঙ্গোপসাগরের পথে সপ্তম নৌবহর

রণাঙ্গনে পাকিস্তানের পরাজয় ঘটেই চলেছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় যখন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ‘সপ্তম নৌবহর’কে ভিয়েতনাম থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওয়ানা হওয়ার আদেশ দিলেন। ডিসেম্বরের ৯ তারিখ সন্ধ্যায় এডমিরাল থমাস মুলারের নিকট নিক্সনের এই আদেশ এসে পৌঁছায়। বঙ্গোপসাগরে ‘সপ্তম নৌবহর’ পাঠানোর নির্দেশ ভারতের জন্য ছিল স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

১৯৭১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট ঘনীভূত হয়, তা একটি আঞ্চলিক সমস্যা ছিল। চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের ফলে তা একটি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেয়। নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের ভৌগোলিক সংহতি রক্ষার প্রশ্নটি তাদের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত রাজনীতির অংশ করায় তা দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়। কিসিঞ্জার, এই রণকৌশলের প্রণেতা, এই যুক্তি দ্বারা চালিত হয়েছিলেন যে সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি ভারতের পক্ষে ও চীনের বিপক্ষে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয় সে পরিস্থিতিতে আমেরিকার চুপ করে থাকা ঠিক হবে না। ভারতের সামরিক পদক্ষেপের ফলে আমেরিকার বিশ্বস্ত মিত্র পাকিস্তান তার পূর্বাংশ হারাতে বসেছে। তাই পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে শক্ত হতে হবে, এই যুক্তির ভিত্তিতে তিনি সামরিক পদক্ষেপের রণকৌশলটি বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হন। এই নৌবহর পাঠানোর উদ্দেশ্য কী। এ প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী লেয়ার্ড জানিয়েছিলেন, আটকে পড়া আমেরিকানদের উদ্ধারে নৌবহর পাঠানো হয়েছে।

তবে সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে চার থেকে পাঁচ দিনের পথ। কিন্তু ততদিনে পাকিস্তানি বাহিনী চারদিক থেকে ঢাকায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ ঢাকার সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর ভারতীয় বিমানের আক্রমণের পর পাকিস্তানি বাহিনী মানসিকভাবে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। সেদিনই গভর্ণরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী ঢাকায় জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব পল মার্ক হেনরীর সাথে বৈঠক করেন। তিনি হেনরীকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আয়োজন করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীকে সসম্মানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার আবেদন জানান। পল মার্ক হেনরী ঢাকায় থাকা আমেরিকান, সোভিয়েতের পাশাপাশি ফ্রান্স আর ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতকে এই ব্যাপারে অবহিত করেন এবং এই প্রস্তাব জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পাঠান। কিন্তু এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরুর আগেই মার্কিন সরকার ইয়াহিয়া খানকে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান করেন এবং জানিয়ে দেন ‘সপ্তম নৌবহর’ বঙ্গোপসাগর এলাকায় কয়েকদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।

মার্কিনি ও চীনাদের ঠেকাতে সোভিয়েত রাশিয়ার পদক্ষেপ

ভারত চুপ করে বসে থাকেনি। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর পাঠানোর ভয়াবহ পরিণতি বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন তাদের হুঁশিয়ার করে দেয় সে অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ভারতকে জানিয়ে দেন, ভারত মহাসাগরে মোতায়েন সোভিয়েত নৌবহর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেবে না।

১৪ ডিসেম্বর ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে মুক্তিবাহিনী। ঢাকার কিছু অঞ্চল ছাড়া সারা দেশ শত্রুমুক্ত। এই সময় ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীকে আরো দুর্বল করে দিতে পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনায় ভারতের বিমান বাহিনীর আক্রমণ অব্যাহত থাকে। এ দিনই নিয়াজীর কাছে ‘যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি নেওয়া হয়।’ এদিকে চীনের সামরিক হস্তক্ষেপের ইচ্ছা না থাকায় থামিয়ে দেওয়া সপ্তম নৌবহরকে আবার বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মিত্রবাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে পাকিস্তানী বাহিনীর প্রতিরোধ ঢাকার খুব অল্প জায়গায় সীমিত হয়ে পড়ে। তখন নিয়াজীর কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না।

অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন নিয়াজী আর মিত্র বাহিনীর পক্ষে জগজিত্ সিং অরোরা। সেই আত্মসমর্পণের দিনেই বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে প্রবেশ করে সপ্তম নৌবহর। কিন্তু ততক্ষণে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম লেখা হয়ে গেছে।