ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দুর্বলতা কাম্য নয়

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩০

ব্যাংকিং খাতের ওপর খুবই বড়ো একটি সংবাদ পড়লাম দৈনিক ইত্তেফাকে। এতে বলা হয়েছে, অবশেষে এক অঙ্কের (সিঙ্গেল ডিজিট) সুদের হার ব্যাংকগুলোতে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে ‘সরল সুদ পদ্ধতিও’। গত ৪ তারিখের সংবাদটিতে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের বিকাশ ঘটবে, বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এই স্বস্তিকর অবস্থাটির সৃষ্টি হয়েছে উচ্চতর আদালতের একটি যুগান্তকারী রায়ের কারণে। উল্লেখ্য, নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করতে উদ্যোগী হন। বিশৃঙ্খলা মনে ঋণের কারণে সৃষ্ট সমস্যা। এর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ব্যাংকঋণের ওপর সুদের হারটি। বহুদিন যাবত্ই ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিগণ বলে আসছিলেন যে, এত সুদ দিয়ে, সুদের ওপর তস্য সুদ দিয়ে ব্যবসা করা যায় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টেকা যায় না। শত হোক, ব্যবসা প্রতিযোগিতার বিষয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, তারা বলছিলেন খেলাপি ঋণের উল্লেখযোগ্য বড়ো কারণ উচ্চ সুদের হার। অর্থমন্ত্রী এ পথ ধরে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। সবচেয়ে বড়ো যে সিদ্ধান্ত, সেটি হচ্ছে শ্রেণিবিন্যাসিত (ক্লাসিফাইড) ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন। ‘সাবস্ট্যান্ডার্ড’, ‘ডাউটফুল’, ‘ব্যাড ভেট’—তিন শ্রেণির ঋণের ক্ষেত্রে তিনি পরিশোধের সময়সীমা প্রত্যেক ক্ষেত্রে তিন মাস করে বাড়িয়ে দেন। পুনঃ তপশিল হতো আগে তিন বছরের জন্য, এখন করা হয় ১২ বছর। ‘ডাউন পেমেন্ট’ লাগত আগে ১০-১৫ শতাংশ। তিনি তা করলেন ২ শতাংশ। অর্থাত্ একজন অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি পাওনা টাকার ২ শতাংশ দিয়েই বাকিটা পরিশোধের জন্য ১২ বছর সময় পাবেন। এক বছর রয়েছে গ্রেস পিরিয়ড। ঋণের ক্ষেত্রে সুদ হিসাব হতো ‘কমপাউন্ড’ হারে, অর্থাত্ ঋণের ওপর সুদ এবং তস্য সুদ যোগ করে তার ওপর আবার সুদ। এটা পরিবর্তন করে করা হয় ‘সরল সুদ’ (সিম্পল ইন্টারেস্ট)। কিস্তি করা হয় ত্রৈমাসিক। আসল ও সুদের যে টাকা আনাদায়ি হয়ে ‘সাসপেন্স’ অ্যাকাউন্ট পড়ে আছে তাও মাফ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। মার্চ মাসের একটি ইংরেজি দৈনিকের খবর থেকে জানা যায়, ঋণটি পুনঃ তপশিল হওয়ার পর আবার নতুন ঋণ দেওয়া হবে। তবে বলা হয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তি দেওয়া হবে। উল্লেখ্য এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো আলোচিত সিদ্ধান্তটি হচ্ছে ‘নয়ছয়’ সিদ্ধান্ত। অর্থাত্, ব্যাংক আমানতের ওপর সুদ হবে ৬ শতাংশ এবং ঋণের ওপর সুদ হবে ৯ শতাংশ। অনেক ব্যাংকের মালিকই এই সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের অনীহা দেখাচ্ছিলেন। এবং তারা নানা অজুহাতে সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি আবার তারা সরকারের সঙ্গে বসেনও। বড়ো একটি হোটেলে বসে তারা ‘নয়ছয়’ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে অঙ্গীকার করেন। তবে কিছু সুযোগ-সুবিধা চান। বলা বাহুল্য, এসব সুবিধা তারা আদায়ও করে নেন। কী ঐসব সুবিধা? ব্যাংকের ক্ষেত্রে করপোরেট কর হ্রাস করা হয়। আমানতের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে কিন্তু নগদ টাকা রাখতে হয় (সিআরআর)। তারল্যের কথা বলে তারা এর হার কমিয়ে নেন। সরকারি সংস্থাগুলো বেসরকারি ব্যাংকে খুব বেশি টাকা আমানত রাখতে পারে না। তারা এ ব্যাপারে একটা সুবিধা চায়। সিদ্ধান্ত হয় সরকারি সংস্থা এখন থেকে ১০০ টাকার মধ্যে ৫০ টাকা বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে পারবে। যে সুদের হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাকগুলোকে ঋণ দেয় (রেপো), সেই ‘রেপো’র হার তারা কমিয়ে নেন। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি হারে ঋণ দিয়ে সমস্যায় পড়ে। তা সমন্বয় করার সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। না, তারা বলে এই সময়ের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব নয়। সরকার তাও বাড়িয়ে দেয়। এদিকে ‘ব্যাংক বোর্ডে’ বিশাল পরিবর্তন আনা হয়। একটি বেসরকারি ব্যাংকের বোর্ডে এক পরিবারের দুই জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারত না। তাও মাত্র ছয় বছরের জন্য।

ছয় বছরের স্থলে তারা ৯ বছর করিয়ে নেন। দুই জনের স্থলে তারা চার জন করে নেন। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, সরকার ‘নয়ছয়’ নীতি কার্যকর করার উদ্দেশ্যে হেন সুবিধা নেই যে তারা বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে দেয়নি। বস্তুত, বাজার-অর্থনীতির নিয়ম অনেকটা উদারভাবে ভেঙেই সরকার এসব সিদ্ধান্ত নেয়। নিয়ম হচ্ছে, ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অথচ দেশের স্বার্থে, শিল্পায়ন ও ব্যবসায়ের স্বার্থে সরকার সরাসরি এসব সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এর পরও সিদ্ধান্তটি কার্যকর হচ্ছিল না। এর মধ্যে অবশ্য একজন আইনজীবী উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হন। তার কথা পুনঃ তপশিলের নিয়মনীতি মানা হলে দেশের ক্ষতি হবে। ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা চলছে। তার সুরাহা হওয়া দরকার। এই আরজির প্রেক্ষাপটে মহামান্য উচ্চতর আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নানাবিধ প্রশ্ন রাখেন, নথিপত্র চান। দীর্ঘদিন উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর মহামান্য উচ্চতর আদালত ঋণ পুনঃ তপশিলিকরণ সংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনা বহাল রাখেন। সবাই অপেক্ষা করছিলেন আদালতের দিকে চেয়ে। কাঙ্ক্ষিত রায় পাওয়ার পর এখন আর ঋণ পুনঃ তপশিলিকরণের পথে কোনো বাধা রইল না।

ইতোমধ্যে অবশ্য আরেকটি খবরে দেখলাম, ‘একনেক’ বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় ‘ঋণের সুদ ৯ শতাংশ না করায় প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ’ প্রকাশ করেছেন। করারই কথা। কারণ তারই নির্দেশে এতসব ঘটছে। তিনি চান শিল্পায়ন দ্রুততর করতে। তিনি চান খেলাপি ঋণ কমাতে। তিনি চান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দেশে গড়ে উঠুক। যুবকদের, বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হোক। এই উদ্দেশ্যেই ঋণ পুনঃ তপশিলিকণের নিয়মাবলি শিথিল করা, এই উদ্দেশ্যেই ‘নয়ছয়’ সিদ্ধান্ত। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, এত সুদ দিয়ে ব্যবসা করা যায় না। এটা অন্যরা না বুঝলেও ব্যবসায়ীরা বোঝেন। মুশকিল হচ্ছে, যারা পোশাক তৈরির ব্যবসায় করেন, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় করেন, বস্ত্র ওষুধ সিমেন্ট, স্টিল, ইত্যাদি ব্যবসায় করেন তারাই ব্যাংকের মালিক। তারাই বিমা কোম্পানি ও লিজিং কোম্পানির মালিক। তাহলে দায়-দাবি কার কাছে? কার সিদ্ধান্ত কে নেবে? সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তো এখানে জড়িত হওয়ার কথা ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর জড়িত হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিজেরা বসে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন ব্যাংক মালিকরা। না, সেটা হয়নি, সেটা হচ্ছে না। এখন মহামান্য আদালতের রায়ের প্রেক্ষাপটে একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, রায়ের এক মাসের মধ্যেই ‘নয়ছয়’ নীতি কার্যকর করা হবে। উত্সাহব্যঞ্জক খবর হচ্ছে, “উচ্চ আদালত ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার ওপর গুরুত্বরোপ করেছে।”

একটা খবরে দেখলাম, এর পরও ‘একনেক’ সভাতে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতেই একজন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ সুদহার কার্যকর আমরা কীভাবে করব? কেননা এটা করতে গেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হয়। এর সঙ্গে বাড়তি খরচ রয়েছে ৩ শতাংশ। কিন্তু ৬ শতাংশ সুদে আমানত পাওয়া যায় না। এই বক্ত্যের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। করারই কথা। ইতিমধ্যে সঞ্চয়পত্রের বেচাকেনা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এটা সুদের হার কমানোর ফলে নয়, হয়েছে কড়াকাড়ি আরোপের ফলে। এমতাবস্থায় যে টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োজিত হতো তা ব্যাংকে আসার কথা। এদিকে সঞ্চয়কারীদের টাকা পুঁজিবাজারেও যাচ্ছে না। এই বাজারের অবস্থা হতাশাজনক। জমিজমার বেচাকেনাও খুবই কম। লাফিয়ে লাফিয়ে যেভাবে জমিজমা ও ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছিল তা অনেকটা বন্ধ হয়েছে। এমতাবস্থায় মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকের দিকেই ধাবিত হওয়ার কথা। অথচ বাজারের খবর, আমানত সেভাবে বাড়ছে না। অনেক ব্যাংক তাই  ৮-৯-১০ শতাংশ সুদ দিয়ে এখনো আমানত নিচ্ছে। সরকারি ব্যাংকের কথা অবশ্য আলাদা। তারা মোটামুটি তা বাস্তবায়ন করেছে। ৯ শতাংশ হারে ঋণ দিতে হলে ৬ শতাংশ হারে আমানত পেতে হবে—এ কথা অযৌক্তিক কিছু নয়। কিন্তু প্রায় ৬ শতাংশ হারের মূল্যস্ফীতির বাজারে আমানতকারীরা ৬ শতাংশে টাকা ব্যাংকে রাখবে, এর ভরসা কোথায়? তাহলে কি ‘৯-৬’ নীতি কার্যকর হবে না? হওয়া দরকার। এই ক্ষেত্রে সরকার দুইভাবে ব্যাংকগুলোকে পুষিয়ে দিতে পারে। হয় আমানতের সুদে, নয়তো ঋণের ওপর সুদে সরকার ভর্তুকির কথা চিন্তা করতে পারে। এতে উভয় পক্ষ, যথা : আমানতকারী এবং ব্যবসায়ী লাভবান হতে পারে। আমনতকারীদের আমানতে যদি সুদের হার কমানো হয়, তাহলে মানুষের আয় কমবে। আয় কমলে ভোগ (কনজামশন) কমবে। এটা তো ‘জিডিপিকে’ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া রয়েছে সঞ্চয়ের প্রশ্ন। মানুষ এই মুহূর্তে শেয়ারবাজারে যাবে না। সঞ্চয়পত্র তারা পাবে না—এটা নিরুত্সাহিত। ব্যাংকেও সুদের হার মূল্যস্ফীতির হারের নীতি। তাহলে সঞ্চয়কারীরা যাবে কোথায়—এই প্রশ্নটিরও একটা সদুত্তর খুঁজে বের করতে হবে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি যেমন দরকার, তেমনি দরকার সঞ্চয় ও আমানত। এসব বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চ আদালতের রায় মান্য করে সরকার ও ব্যাংকগুলোকে একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে। সাপও যাতে মরে, লাঠিও যাতে না ভাঙে।

n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়