>> মাহবুব নাহিদ
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। ক্ষুধা মানুষের স্বাভাবিক একটি জৈবিকপ্রক্রিয়া। মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদে ক্ষুধা নিবারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এখনো পৃথিবীতে বহু মানুষ রয়েছে, যারা ক্ষুধা নিবারণ করার ক্ষমতা রাখে না। আর ক্ষুধা থেকেই জন্ম নেয় অপুষ্টি। পৃথিবীতে বহু মানুষ অপুষ্টিতে ভুগে, ভুগে অপুষ্টিজনিত নানা ধরনের রোগে। ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অরগানাইজেশনের (এফএও) মতে পৃথিবীতে ৭৯৫ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। আর বাংলাদেশের ২৬.৩ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। আর সেইভ দ্য চিল্ড্র্রেনের মতে, আমাদের দেশে ৬ মিলিয়ন শিশু আছে, যারা অপুষ্টিতে ভুগছে।
এই ক্ষুধার্ত মানুষদের ক্ষুধা নিবারণের মহত্ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে ‘ভাতব্যাংক’ নামের একটি সংগঠন। প্রতিষ্ঠাতা লুত্ফুল হাসান জানালেন তাদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
২০১৭ সালের ১৭ মে যাত্রা শুরু করে ভাতব্যাংক। তখন লুত্ফুল হাসানের সঙ্গে আরো ছিলেন সাইয়্যেদ আহমেদ হাসনাইন, ওয়াহিদ বিন মুকতার। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা কিছু মানুষকে খাবার খাওয়ানো দিয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীকালে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন সারাগ বেগ। বর্তমানে তাদের কাজের কলেবর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ভাতব্যাংক। তাদের সংগঠনের রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক। তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে অনেক নারীও রয়েছে। ভাতব্যাংক প্রতি শুক্রবার মোহাম্মদপুর শেকেরটেক ১ নম্বর রোডে ৪০০ মানুষকে দুপুরের খাবার খাওয়ায়। তাদের কাছে যারা খাবার খেতে আসে, তারা কেউ পথশিশু, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী। যারা ১৫ মিনিটের বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিতে পারে, তাদের আসলেই খাবার প্রয়োজন বলে মনে করে ভাতব্যাংক। আর বাজার করা থেকে শুরু করে, রান্নাবান্না সবকিছুই তারা নিজেরা তদারকি করে। যাতে কোনোভাবেই অস্বাস্থ্যকর কিছু মানুষের পেটে না যায়, সে ব্যাপারে দারুণভাবে সচেষ্ট তারা।
যারা পেশাগতভাবে ভিক্ষা করে, তাদের এই ধরনের কাজ থেকে সরে আসতে মানসিকভাবে সাহায্য করে ভাতব্যাংক। তারা এসব মানুষকে বুঝায়, মোটিভেট করার চেষ্টা করে। সংগঠনটির সদস্যরা তাদের আশপাশের মানুষকে সাহায্য করতে বদ্ধপরিকর। তারা যখন খাবার খায়, তখন কোনো মানুষ এসে খাবার চাইলে কখনো না করে না। মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অন্তত তাকে দুইটি ভালো কথা বলে হলেও সাহায্য করতে চেষ্টা করে সংগঠনটি।
এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় ভাতব্যাংক। কিছুদিন আগে মিরপুরের বস্তিতে আগুন লাগার পরে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিজেদের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করেছে সংগঠনটি। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ সাহায্য করেছেন তারা। বর্তমানে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্যও ত্রাণ সাহায্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তাদের ভিন্ন একটি প্রজেক্ট রয়েছে। সেখানে যারা পড়াশোনা করতে পারে না, তাদের পড়ালেখায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিমাসে খাদ্যসামগ্রী দিয়ে থাকেন। তবে স্কুলে তাদের অন্তত ৬০ ভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া চাই। ভালো ফলাফল করলে থাকে পুরস্কার আর খারাপ করলেও থাকে সঠিক পথে আনার ব্যবস্থা।
বিভিন্ন বড়ো উত্সবের সময়ে তারা গরিব শিশুদের জামাকাপড় দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই দেওয়ার পদ্ধতি একটু ভিন্ন। সাধারণ নিয়মে নয়, বাচ্চাদের তারা দোকানে নিয়ে যান। সেখান থেকে তারা নিজেরা পছন্দ করে জামা নেয়।
তাদের চলার পথের প্রথম দিকে কিছু বাধা এসেছে, কিন্তু সকলের সহযোগিতা আর সংগঠনের শক্তি, স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্যম তাদের এগিয়ে এনেছে বহুদূর। স্বেচ্ছাসেবক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত—সবার অর্থায়নে এই কাজ করে থাকে সংগঠনটি। তবে তাদের কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে, যারা সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। আর যে তরুণেরা ভালো কিছু করতে চায়, তাদের একত্রিত করে একটা সম্মিলিত শক্তিতে পরিণত করাই সংগঠনটির লক্ষ্য।
ভাতব্যাংকের একটি স্লোগান রয়েছে, তা হলো ‘লেটস অল এন্ড হাঙ্গার’। সংগঠনটি চায় এদেশ ক্ষুধামুক্ত হোক। মানুষের ক্ষুধা দূর করার জন্য আরো অনেকেই এভাবে এগিয়ে আসুক, এমন প্রত্যাশা তাদের। তবে তাদের প্রত্যাশা, এক্ষেত্রে যারাই কাজ করুক না কেন, তারা যেন দেখেশুনে সাহায্য করে। যেমন সঠিক মানুষ যেন সাহায্য পায়, একই মানুষ যেন বারবার না-পায় আর প্রকৃত অভাবী মানুষেরা যেন অবহেলিত না হয়।
ভাতব্যাংক স্বপ্ন দেখে, এদেশে কোনো মানুষ খাদ্যের অভাব ও অপুষ্টিতে ভুগবে না। আর তারা একদিন দেশের প্রতিটি কোনায় এভাবে মানুষকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারবে।
