নবনীতা দেবসেন

যেমনটা জানি তাঁকে রচনা ও বাস্তবে

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৩১

সম্প্রতি (৭ নভেম্বর, ১৯৩৮) চলে গেলেন দুই বাংলার খ্যাতনামা কবি-লেখক-প্রাবন্ধিক-গবেষক-শিক্ষক নবনীতা দেবসেন। দক্ষিণ কলকাতায় হিন্দুস্থান পার্কে তাঁর বাবা-মা’র ‘ভালবাসা’ গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নরেন্দ্র দেব ও মাতা রাধারানী দেবী সেযুগের বিশিষ্ট কবি-দম্পতি। ছেলেবেলায় এক বিশেষ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে তিনি বড়ো হয়েছেন। বাংলা ও ইংরেজি ছাড়া হিন্দি, ওড়িয়া, অসমীয়া, ফরাসি, জার্মান, সংস্কৃত এবং হিব্রু ভাষাগুলো পড়তে পারতেন। গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস, লেডি ব্রেবোর্ন ও প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর, হার্ভার্ড, ইন্ডিয়ানা (ব্লুমিংটন) ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন। ১৯৭৫—২০০২ তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপিকা ও বেশ কিছুকাল বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। তাঁকে তুলনামূলক সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট অথরিটি মানা হয়। যাদবপুরে তিনি কবি বুদ্ধদেব বসু ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্নেহধন্য ছাত্রী ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার পান তাঁর আত্মজীবনীমূলক রম্যরচনা ‘নটী নবনীতা’ গ্রন্থের জন্যে। এছাড়াও তিনি মহাদেবী বর্মা ও ভারতীয় ভাষা পরিষদ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকেও বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯৫৯-এ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম প্রত্যয়’ প্রকাশিত হয় এবং প্রথম উপন্যাস ‘আমি অনুপম’ ১৯৭৬-এ। কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস মিলে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৩৮। ১৯৬০-এ তিনি বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ (পরবর্তীকালে নোবেলজয়ী) অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা। জ্যেষ্ঠা অন্তরা সাংবাদিক ও সম্পাদক এবং কনিষ্ঠা নন্দনা অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর ৮১ বছর বয়সে কলকাতায় তাঁর নিজের বাড়িতে প্রয়াত হন তিনি।

নবনীতা দেবসেন প্রয়াত হবার পর তাঁকে নিয়ে ওপার বাংলার বিশেষত অগ্রজ-অনুজ সব প্রজন্মের নারী লেখক-কবি-অনুবাদক-প্রাবন্ধিকদের স্মৃতিকাতর নানা রচনা, আলাপচারিতা থেকে বুঝছি—শুধুই নারী লেখকদের জন্য ‘সই’ নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠা নয়, কত সৃজনশীল-মননশীল-সাংগঠনিক কাজই না দশ হাতে করে গেছেন এই দশভুজা! ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইতোপূর্বে অপ্রকাশিত বা অমুদ্রিত নবনীতার এক আলাপচারিতা (আজ, চতুর্থী) থেকে জানা যাচ্ছে : 

‘কবিতা অজস্র লিখেছি। কবিতা অনেকটা জায়গা নেয়। মনে অনেকটা জায়গা নেয়। খাতায় কম নেয়। গদ্য লিখতে শারীরিক যায়। এতবছর শুধুই গদ্য লিখেছি তা তো নয়। মনে-মনে আর খাতার পাতাতেও অজস্র পদ্য লিখেছি সেগুলি বই হয়ে বেরোয়নি। গদ্য একবারে লেখা যায়, শুরু করলে শেষ হয়। আমার কবিতা আধাখ্যাঁচড়া হয়ে মাসের পর মাস পড়ে থাকে। ২০০৫য়ে লিখতে শুরু-করা কবিতাও আমি ২০০৯য়ে শেষ করেছি। কবিতা মাথার মধ্যে ঘোরে। গদ্যও ঘোরে। কিন্তু গদ্য তো একবার লেখা শুরু করলে শেষ করে ফেলতেই হয়। গদ্য যেমন আমার কথা শোনে, কবিতা কিন্তু আমার কথা শোনে না। আমি কবিতার কথা শুনে চলি। গদ্য অনেকসময় ফরমায়েশি লেখা হয়ে যায়। কবিতা ফরমায়েশি লিখতে গেলে কেলেঙ্কারি। সেখানে আমি নাচার। লিখিত কবিতা হাতে না থাকলে আমি ফরমাশমতো দিতে পারি না। ১৯৫৯য়ে প্রথম কবিতার বই বেরোল। তারপর ’৭১য়ে। তারপর, প্রথম কবিতাবইয়ের পঞ্চাশ বছর পর আমার একটা কবিতার বই বেরোল :তুমি মনস্থির কর।’

‘রবীন্দ্রনাথের দেয়া নাম আমার কোনওদিন ভালো লাগত না। কারণ আমার কোনও বন্ধুরই এই নাম ছিল না। লোকে ভুল করে আমাকে নিবেদিতা, নন্দিতা, নমিতা এবং অবনিকা বলে ডাকত। নবনীতা নামটার মধ্যে আমি কোনও ছবি পাই না। ছন্দও পাই না!’

‘আরেকটা কী জানিস তো, এটা বুদ্ধদেব বসু শিখিয়ে গেছেন আমাকে, তা হল, যখন নিজে লিখতে পারি না, তখন কবিতা অনুবাদ করি। মাঝেমাঝে খুব চেষ্টা করলেও কবিতা আসে না। কবিতার বিরহে খুব কষ্ট হয়। সেই সময়টা অনুবাদের সময়। দুটি মেয়ের কবিতা অনুবাদ করে আমি মুগ্ধ। একজন রাশিয়ার মেয়ে। মারিয়া েশ্বতায়েভা। আরেকজন ইনর্গ্রিভ ইয়ঙ্কার। সাউথ আফ্রিকার মেয়ে। আফ্রিকান ভাষার লেখিকা।’

আর সবকিছুর মতোই নতুন প্রজন্মের কথাও স্বাভাবিকভাবেই গড়িয়ে গড়িয়ে এল—

‘দেখছি কী জানিস, কিছু ছেলেমেয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং-য়ে বিশেষ উত্সাহী। কিন্তু সেটা ইংরেজিতে। এতদিন যে উত্সাহ আমরা দেখেছি শুধু বাংলায়, লিটল ম্যাগাজিন করায়, এখন সেটা ছড়িয়ে পড়েছে ইংরেজি সাহিত্য সৃষ্টিতে। এখন সবই ‘সাউথ এশিয়ান ইংলিশ’ বলে চলে যায়। ইংরেজিতে লেখা একটা জুয়াখেলার মতো। ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ স্টাইলে। ঠিক ঠিক ফর্মুলা জোগাড় করে একটা লেখা দাঁড় করাতে পারলে বলা যায় না, ছপ্পর ফাড়কে কুবেরের আশীর্বাদ ঝরতে পারে। বাংলায় লিখে পয়সা হয় না। এরা গ্লোবাল হতে চায়।’

ওপার বাংলার অন্তর্জাল ভিত্তিক পত্রিকা ‘চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে’ বিশিষ্ট কবি-লেখক-অনুবাদক যশোধরা রায় চৌধুরী শুরুতে কবি নবনীতা দেবসেনের একটি কবিতাই উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন শেষ কবিপ্রণামী নিজস্ব ভাষায় :

‘শুধু তুমি সুস্থ হবে।

আমি দিয়ে দেব আমার কোজাগরীর চাঁদ,

শাদা দেয়ালের ময়ূরকণ্ঠী আলো,

দিয়ে দেব বিগত বছরের মরা পাখির মমতা,

আর আগামী বছরের কলাগাছটির স্বপ্ন।’

(আরোগ্য, নবনীতা দেবসেন)

একটি উজ্জ্বল প্রাণবন্ত হাসি ও দুই মেধাবী চক্ষুর ছবিটি রয়ে গেল পাঠকের চিত্তে। এই লেখা যখন লিখছি তার ঠিক ঘণ্টাতিনেক আগে জেনেছি উনি নেই। উনি যে অসুস্থ সে কথাটা তার আগে থেকেই জানি। গত রবিবার, মানে ঠিক পাঁচ দিন আগে, এক পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, আক্রামক কর্কটরোগকে নিয়ে, আই ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি, জানিস আমি স্যান্ডো করি! সে লেখা সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তে ভাইরাল। এতটা প্রাণশক্তি নিয়ে, মৃত্যুকে এতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আর কারোকে লিখতে দেখিনি আমরা। না সাম্প্রতিক কালে, না অতীতে। জীবনকে একশো দশ শতাংশ বেঁচে নেবার কারিকুরি তিনি জানতেন, আমাদের শেখাবার চেষ্টা করেছিলেন। একজন কর্কটরোগীর মুখে এতটা জীবনকে ভালোবাসার কথা শুনলে জীবনের প্রতি নতুন করে বিশ্বাস ফিরে আসে। এই অ্যাটিচিউডই নবনীতা দেবসেন।’

‘পাঠকভাগ্য ভালো কিন্তু সমালোচক-ভাগ্য ভালো নয় আমার। ছাপার হরফে ভালবাসা কিছুই প্রায় নেই। কোথাও রিভিউয়ের রেফারেন্স কোট করতে চাইলে দিতে পারি না।’ বলেছিলেন সাহিত্যিক নবনীতা।

কেন? কারণ তাঁর লেখা নারীকেন্দ্রিক। নারীর নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্য, যাকে ফ্রান্সে বলা হতো ecriture feminine.

‘আমার লেখা সবই নারীকেন্দ্রিক, রূপকথাও নারীপ্রধান, আমার নারীবাদটুকু সর্বত্র ছড়িয়ে মিশিয়ে রয়েছে। আমার চেষ্টা মেয়েদের স্থানটি সামনে এগিয়ে নিয়ে আসা। ‘কর্ম’ থেকে সরিয়ে ‘কর্তার’ জায়গায় বসানো। আমার পৌরাণিক গল্পগুলিও তাই। সমাজের শিরায়-শিরায় সঞ্চারিত করে দিতে হবে নারীবাদী ভাবনা, নারীর ক্ষমতা, নারীর প্রতি সম্মান। যোগ্যতা অতি সামান্য, কিন্তু বারবার যখন অন্য রকম লিখতে ইচ্ছে করে, বার বার থমকে যাই। ওসব বড় বড় লেখা লেখার অবসর তো অন্যদের আছেই। এইসব ‘মেয়েলি’ লেখা আমরা না লিখলে লিখবে কে?’ বলেছিলেন নবনীতা।

নবনীতা দেবসেনের লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে ‘দেশ’ পত্রিকার মাধ্যমে। ‘দেশ’ পত্রিকায় একদম কিশোরী বয়সে তাঁর একাধিক লেখা পড়ার অভিজ্ঞতা আগে একটু বলে নিই। নীরদ সি চৌধুরীর ‘তথাকথিত বাংলাদেশ’ নামে বিতর্কিত লেখাটি প্রকাশের আগ পর্যন্ত ‘দেশ’ পত্রিকা খুব নিয়মিত বাংলাদেশে আসত এবং আমাদের বাসায় প্রতিটি সংখ্যাই রাখা হতো। সেখানেই নবনীতা দেবসেনের একটি লেখায় ‘সংস্কৃতি’ কী এটা নিয়ে দুর্দান্ত একটি প্রবন্ধ ছিল। সংস্কৃতি কি শুধুই ভারত থেকে ভরতনাট্যম শিল্পীদের দল, তেজান বাঈয়ের ‘মহাভারত’ আর হাতি রাশিয়ায় গেল আর রাশিয়া থেকে ব্যালে নাচের দল ভারতে এল তা-ই নাকি আরো অন্য কিছু? ছাত্রী বয়সে হোস্টেলে থাকার সময় দক্ষিণ ভারতের কোনো এক প্রদেশের মেয়ে (প্রদেশের নামটি মনে নেই—প্রবন্ধটি পড়ি ১৫/১৬ বছর বয়সে) একদিন জানালার সামনে দাঁড়িয়ে নবনীতাকে চুল আঁচড়াতে দেখে দৌড়ে এসে জানালা বন্ধ করে দিয়ে আহত চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি এমনটা করবে ভাবতে পারিনি!’ থতমত নবনীতা পরে জানতে পারেন যে দক্ষিণ ভারতের ঐ প্রদেশে কোনো নারী যদি জানালার সামনে বা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ান যা কোনো পথচারী পুরুষ দেখতে পারে, তবে সেই নারীকে ‘গণিকা’ মনে করা হয়। একই ভারতের একটি সিনেমায় ছেলে যুদ্ধে যাবে শুনে উড়িষ্যার এক মা মূর্চ্ছিত ও পাঞ্জাবি মা খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ছেলেকে যুদ্ধে যেতে বলার যে পার্থক্য ‘উহা’-ই সংস্কৃতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে ব্রিটেনে এক পশ্চিম পাকিস্তানি নারীর সাথে ঢাকার আরেক ছাত্রীর ‘মুসলমানের মেয়ের টিপ পরা উচিত কি অনুচিত’ বিতর্ক শুনে নবনীতার মনে হয়েছিল পূর্ব বাংলা ভবিষ্যতে আলাদা পথে হাঁটতে পারে। কাজেই সংস্কৃতি শুধুই ‘ব্যালে’ আর ‘ভরতনাট্যম’-এর আদান-প্রদান নয়। অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কার পাবার পর স্তব্দ বিস্ময়ে পড়েছি প্রাক্তন জীবনসঙ্গীর মেধা ও কঠোর পরিশ্রম নিয়ে দিলখোলা প্রশংসা। ভোর সাড়ে চারটায় লন্ডনের শীতের তুষারপাতের ভেতর নবনীতা যখন লেপ ছেড়ে উঠতে পারছেন না, প্রাচীন গ্রিক অর্থনীতি পড়ার জন্য অমর্ত্য গ্রিক ভাষার ক্লাস করতে ছুটছেন—এই নিবন্ধও ‘দেশ’ পত্রিকায় পড়েছি। কন্যা সন্তানের সাথে মোপেডে চড়া শেখাসহ নানা কৌতুকভরা লেখা পড়েছি তাঁর। ‘দেশ’-এ তাঁর কবিতাও পড়েছি অসংখ্য।

সেই নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে পরিচয় হলো দিল্লিতে ২০০৩-এ ‘ইউকে-সাউথ এশিয়া উইমেন রাইটার্স কনফারেন্স’-এ।

দিল্লিতে গিয়ে পরিচয় হলো নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে। ওমর খৈয়ামের অনুবাদক নরেন্দ্র দেব ও রাধারানী দেবের কন্যা, অমর্ত্য সেনের প্রাক্তন স্ত্রী এবং এসব ছাপিয়ে নিজেই যশস্বী অধ্যাপক-লেখক-কবি—যাঁর এক কন্যা অন্তরা দিল্লি থেকে ইংরেজিতে ‘দ্য লিটল ম্যাগাজিন’ সম্পাদনা করেন এবং অপর কন্যা নন্দনা নামী অভিনেত্রী—এমন এক মানুষ এত সহজভাবে আমাকে এত আদর করলেন, এত বকবক করলেন এবং এত গল্প করলেন যে বলার না! (আরে, মা ও মেয়ে দুজনকেই দিদি লিখছি) আমাকে তাঁর সম্পাদিত ‘লিটল ম্যাগাজিন’ দিয়ে লেখাও দিতে বলেছিলেন। আমি হকচকিয়ে গেছিলাম তাঁদের অসামান্য বিনয় ও সৌজন্যে। এই যে এমন হাসি-খুশি, দিল-দরিয়া নবনীতা দেবসেনের দুঃখ ছিল না বুঝি? আসমুদ্রজলধিসম? তারও পরিচয় সেই সম্মেলনেই পেলাম। একটি সেশন ছিল ‘হাসি’ বা ‘লাফটার’ নামে। খুব অবলীলায় হাসতে হাসতে অনর্গল ইংরেজিতে বললেন, ‘আমার যখন ডিভোর্স হয়, আশপাশের মানুষের তখন তো সমবেদনা আর করুণার অন্ত নেই। সেসব ঢাকতে আমি আর আমার মেয়েরা আরো হাসতে শুরু করলাম। আমরা আরো বেশি বেশি হাসি।’

সেই জায়গাটায় শ্রোতৃবর্গের অধিকাংশই আমরা যারা নারী ছিলাম, তাদের চোখ ছলছল করে উঠল।

বহু ভাষা-ভাষী রাষ্ট্র বলেই ভারতে মধ্যশ্রেণির লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজি। মুম্বাইয়ে ফলওয়ালা বা ট্যাক্সিওয়ালার পাশাপাশি একবার এক ভিখিরিকেও নিখুঁত ইংরেজিতে ভিক্ষা চাইতে দেখেছিলাম। বাংলাদেশ একে একভাষী রাষ্ট্র বলতে গেলে, তাতে আমার প্রথম বারো ক্লাস বাংলা মাধ্যমেই পড়া। পাঁচ বছর আইনের পড়াটা খুব কেজো এক ইংরেজিতে। তারপর চাকরি-বাকরিতে হয়তো খানিকটা কেজো ইংরেজি দরকার হয় এই যা! নবনীতা দি’র সঙ্গে প্রথম সেশনে ভয়ই ছিল যে ভারতীয়রা হয়তো বাচিকভাবে আমাদের চেয়ে ঢের বেশি সড়গড়। কিন্তু আমি কথা বলার পর সেশন শেষে যখন বললাম, ‘দিদি, একটু নার্ভাস ছিলাম!’ উনি বললেন, ‘কই, তুই ত দিব্যি বললি! ভালো বলেছিস ত!’ এমনি প্রশংসা জোগানো, সাহস জোগানো মানুষ!

এবার লিট ফেস্টে ‘এজিং’ সেশনে খানিকটা বয়সী নারী লেখকদের নাচ নিয়ে এত কথা হলো—এ প্রসঙ্গে নবনীতা দি’র কথাই বলি। হাতে পানীয়ের মষধংং নিয়ে তাঁকে গোল হয়ে ঘিরে ধরা আমি সহ দুই বাংলার কিছু বাঙালি কবি-লেখক-অনুবাদক (ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিমলি ভট্টাচার্য, স্টেটসম্যানের চিত্রলেখা বোস সহ অনেকেই) তরুণীকে তিনি বলছেন, ‘বুঝলি, আমার যখন বয়স ছিল ষোল—ভাবতাম কুড়ি হলেই কুচ্ছিত হয়ে যাব দেখতে—তখন বুঝি মরেই যাব। কুড়িতে এসে মনে হলো অন্তত পঁচিশ পর্যন্ত সুন্দরী থাকব। পঁচিশে এসে মনে হলো ত্রিশেও সুন্দর থাকা যায়। দেখতে দেখতে তোদের মতো... এবার তিনি আঙুল দিয়ে আমাদের দেহ দেখান যেমনটা দুষ্টু ছেলেরা মেয়েদের রাস্তায় দেখায়—খানিকটা কোকের বোতলের মতো আঙুলে এঁকে বললেন, ’...তোদের মতো সুন্দর শরীর কবে আমার বদলে গিয়ে এখন আমার শরীর এই যে বেঢপ মোটা—কবে ষাট পার হয়ে এখনো মনে হয় আমি সুন্দরী। এখনো অনেকদিন বাঁচতে হবে।’ একথায় আমরা সবাই হাসিতে গড়িয়ে পড়ি।

তারই কয়েক বছর পর ঢাকায় একটি প্রোগ্রামে এসেছেন শুনে ছুটতে ছুটতে গেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। লাঠি ভরকরা, খানিকটা বুড়িয়ে যাওয়া এই মানুষটা কয় বছর আগের নবনীতা দি? থমকে যেতে যেতে মাত্র তাঁর কাছে যাব, এমন সময় ঢাকার খুব নামী দুই সাংস্কৃতিক আইকন তাঁকে গাড়িতে তুলে নিলেন।

বাংলায় ‘চন্দ্রাবতী’ রচিত রামায়ণ থেকে শুরু করে তেলেগু, মারাঠি বা মৈথিলি ভাষায় নারী রচিত ‘রামায়ণে’ রাম কতটাই নারী নিপীড়ক সেই বয়ান আর সীতা তথা ভারতীয় নারীসমাজের শতাব্দীব্যাপী বঞ্চনার স্বর তুলে ধরেছেন নবনীতা দেবসেন তাঁর একটি লেখায় :

বিশ্বের মহাকাব্য রচয়িতারা সকলেই পুরুষ। তাঁরা নিজেদের কাব্যে বন্দনাও করেছেন পুরুষের, অস্ত্রধারী বীরদের। বছরকয়েক আগে করা এক গবেষণায় লক্ষ করেছিলাম, যে ৩৮টি মূল উপকরণের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের অধিকাংশ মহাকাব্যগুলো দাঁড়িয়ে, তার মধ্যে মহিলাকেন্দ্রিক মাত্র ন’টি। বোঝাই যাচ্ছে, মেয়েদের সঙ্গে মহাকাব্যের জগতের বিশেষ সম্পর্ক নেই, নায়কোচিত জৌলুস মেয়েদের জন্য নয়। অপহূত হওয়া, উদ্ধার হওয়া, জুয়ার পণ হওয়া, নির্যাতিত হওয়া বা অপমানিত হওয়া ছাড়া তাঁদের সেখানে বিশেষ কিছু করার নেই। কিন্তু যদি কখনও কোনও মেয়ে মহাকাব্যের চেনা গল্প নতুন করে বলতে বসেন? ঠিক কেমন হতে পারে সেই গল্প? উত্তর হিসেবে বেশ কয়েকটা বিকল্প ভাবা যেতে পারে।

১. গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ন রেখে পুরুষ কথাকারের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণেই গল্প বলা, ঠিক যেভাবে মল্লা তাঁর ষোড়শ শতকের তেলুগু রামায়ণ সাজিয়েছিলেন।

২. গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ন রেখেও মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্প বলা। যেমন বলেছিলেন চন্দ্রাবতী, তাঁর ষোড়শ শতকের বাংলা রামায়ণে।

৩. গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ন রেখে আদর্শবাদী জায়গা থেকে তাকে উপস্থাপন করা। যেমন মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন করে রামের গল্প লিখেছিলেন রঙ্গনায়কাম্মা, তাঁর রামায়ণ বিষবৃক্ষম বইয়ে।

৪. সীতার গল্পের মধ্যে দিয়ে আসলে নিজেরই জীবনের গল্প বলা। ঠিক যেমন শত-সহস্র বছর ধরে বলে আসছেন আমাদের গ্রামের মেয়েরা।

আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। হঠাত্ করেই চন্দ্রাবতী রামায়ণ নতুন করে পড়তে শুরু করেছিলাম। পড়তে গিয়ে বুঝলাম, মেয়েদের রামায়ণ একেবারে আলাদা একটা গল্প বলে। তখন থেকেই মেয়েদের মুখে রামায়ণের গল্প আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। চন্দ্রাবতীর রামায়ণ, মল্লার রামায়ণ এবং রঙ্গনায়কাম্মার রামায়ণের ওপর আমার বেশ কিছু কাজ নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে।

আঞ্চলিক ভাষায় রামায়ণের গল্প মেয়েদের মধ্যে প্রথম বলেন মল্লা ও চন্দ্রাবতী। দু’জনের মধ্যে মিল ছিল প্রচুর। দু’জনেই পেশাদার কবি হতে চেয়ে স্বেচ্ছায় অবিবাহিত থেকে গিয়েছিলেন। দু’জনেই শিবের ভক্ত, অথচ রাম-কথা রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁদের পথ ছিল ভিন্ন। মল্লা জাতিতে শূদ্র রমণী হয়েও ধ্রুপদী রামায়ণ রচনা করে ব্রাহ্মণ সভাকবিদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে চন্দ্রাবতী যে রামায়ণ লিখলেন, তা শুধু সীতার কথা বলে, একজন মহিলার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে রামের। রাজসভায় মল্লার রামায়ণ পাঠ করতে দেননি ব্রাহ্মণেরা। আর চন্দ্রাবতীর রামায়ণকে সমালোচকেরা দুর্বল ও অসমাপ্ত বলে খারিজ করে দিয়েছেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে আক্রমণ করায় সামাজিকভাবে একঘরে হতে হয়েছে রঙ্গনায়কাম্মাকে।’

লেখাটি আজ সকালে পড়তে পড়তে মনে হলো এই সীতাদের ভেতরে কোথাও স্বয়ং নবনীতা দি’ও যেন আছেন!

 ‘আমাকে নেবাতে পারে এত শক্তি রাখে না সময়।

কখনো ভেবো না আমি সময়ের মুখ চেয়ে থাকি।

সময় আমার সঙ্গে খেলে যাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা।

যতই কাড়ুক শাড়ি, লজ্জাবস্ত্র ঠিক থাকে বাকি,

মন্ত্রবলে বেলা হয়ে যাবে সব, যা ছিল অবেলা।

ধর্মযুদ্ধে প্রতিবাদী চিরকাল দাঁড়ায় নির্ভয়

যেহেতু সপক্ষে তার ঈশ্বর সাধিত মহাকাল

স্বয়ং সারথি হয়ে সব ব্যুহ ভাঙে উত্তাল;

যতই দিক না যুদ্ধ, খণ্ডকাল হবে পরাজিত

এই তো জেনেছি শাস্ত্রে, যতটুকু হয়েছে অধীত।

অখণ্ডকালের পক্ষপাতধন্য আমি মহাশয়

আমাকে রাঙাবে চোখ, এত শক্তি রাখে না সময়

সই ঠিক এইকথাটিই বলে।

প্রতিবাদী হয়ে ওঠে প্রয়োজনে।’

তাঁর কবিতায় বৈদগ্ধ্য। গাঢ় প্রেমের কবিতা লিখতে গিয়েও লেখেন, অনিশ্চয়তা।

 

পাণিগ্রহণ

কাছে থাকো, ভয় করছে, মনে হচ্ছে

এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়, ছুঁয়ে থাকো।

শ্মশানে যেমন থাকে দেহ ছুঁয়ে একান্ত স্বজন

এই হাত, এই নাও, হাত।

এই হাত ছুঁয়ে থাকো, যতক্ষণ

কাছাকাছি আছো, অস্পৃষ্ট রেখোনা।

ভয় করে। মনে হয় এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়।

যেমন অসত্য ছিল, দীর্ঘ গতকাল।

যেমন অসত্য হবে অনন্ত আগামী।

(নবনীতা দেবসেন, ১৯৮৮)