কারার ঐ লৌহকপাট,/ ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট,/ রক্ত-জমাট/ শিকল পূজার পাষাণ বেদী।/ ওরে ও তরুণ ঈশান!/ বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!/ ধ্বংস নিশান/ উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদী—কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ কবিতার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর বিজয়ের কথা বলে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাকে বন্দিশালা মনে করে এর বাসিন্দাদের ওপর যে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছিল তা গুয়েনতানামো কারাগারের বন্দী নির্যাতন থেকেও ছিল ভয়াবহ। কেননা, পাকিস্তানিরা সর্বদিক দিয়ে বাঙালিকে শোষণ করে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। এ কারণে বাঙালির মাঝে জন্ম নিয়েছিল অসন্তোষ, জন্ম নিয়েছিল আন্দোলন। এসবের অনুঘটক, এসবের সঞ্চালক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিদারুণ বৈষম্য কবলিত বাঙালির মাঝে প্রতিবাদী চেতনার বহ্নিশিখা বইয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ধারাবাহিক নেতৃত্ব ও অসামান্য ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে সারা বাংলার মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল যার ফলাফল দেখতে পাওয়া যায় সত্তুরের নির্বাচনে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ অধিবেশন আহ্বান করে আকস্মিকভাবে ১লা মার্চ এই অধিবেশন মূলতবি করে ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে হাত দিলেন যেন। এই বিষয়ে পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী তার বই- ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ বইতে লিখেছেন— ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণার পরপরই সমগ্র বাঙালি জাতিই যুদ্ধের পথে নেমে গিয়েছিল। আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই, অধিবেশন মূলতবি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আসলে পাকিস্তানের ভাঙন ঘটেছিল। প্রতিবাদী বাঙালি তাদের এই অন্যায় কৌশলকে মেনে নিতে পারেনি। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশজুড়ে প্রতিরোধের জোয়ার বয়ে যেতে থাকে।’
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সৃষ্টি হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবল জোয়ার। এই জোয়ারকে রুদ্ধ করতে পাকিস্তানি শাসকরা পঁচিশে মার্চ রাতের অন্ধকারে বেছে নেয় লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যা করার মতো জঘন্য এক পথ। কিন্তু বাঙালি দমে যায়নি। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে যুদ্ধের ময়দানে বীরদর্পে লড়াই করে। মিঁয়াওয়ালি কারাগারের অন্ধকারের প্রকোষ্ঠে বন্দি জাতির পিতার অস্তিত্ব রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের কাছে প্রতি মুহূর্তেই দেদীপ্যমান ছিল মনের কোণে। অতঃপর ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে, লাখ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ষোলোই ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে এনে এই দেশের মাটিতে উড়িয়ে দেয় লাল-সবুজের পতাকা। এজন্য এই বিজয়ের দিনটি প্রতিটি বাঙালির জন্য আবেগের, গর্বের, ভালোবাসার।
একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর দিনটি ছিল দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর বাঙালির মুখে আনন্দোচ্ছ্বাসের জলতরঙ্গে হাসার দিন। ঐ দিনের চারটা একত্রিশ মিনিট ছিল এক অভূতপূর্ব সুখৈশ্বর্যময় মুহূর্ত। যখন নিয়াজি তেরানব্বই হাজার সৈন্যসমেত আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে তখন কেবল রেসকোর্স ময়দানই নয়, যেন পুরো ধরণীজুড়েই শুরু হয় হর্ষধ্বনি। ঐ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহত্ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। ঐ সময়টায় মুহুর্মুহু করতালি আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো রেসকোর্স ময়দান। লন্ডনের নিউ টাইমস পত্রিকা সেই সময় বলেছিল, ‘রক্তই যদি কোনো দেশের স্বাধীনতা অর্জনের অধিকারের মূল্য বলে বিবেচিত হয়, তবে বাংলাদেশ অনেক বেশি দাম দিয়েছে।’ সেই দামের বিনিময়েই আমাদের মহান বিজয়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি যখন মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে নিজের রিভলবার জমা দেয়, তখন এদেশের লাখো শহিদের আত্মাও যেন বলে উঠেছিল, ‘জয় বাংলা’। ঐ মুহূর্তটি বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গৌরবের সন্ধিক্ষণ। পৌরাণিক মহাকাব্যের অতি মানবিক নায়ক যেমন করে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন, ঠিক তেমন রুপেই আবির্ভূত হয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির জন্য চির শান্তির বার্তা বয়ে আনেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । আর এই মহান বীর বাঙালি হয়ে উঠেন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের পথে আজ দেশ। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক-শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সকল ক্ষেত্রে আজ তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে উন্নতির ছোঁয়া। দেশের যে ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে তাতে আজ বাঙালিরা স্বপ্ন দেখতে পারছে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছার। এ বাঙালি জাতির জন্য অনেক বড় অর্জন। এদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের বিচারকার্য সুসম্পন্ন হওয়ার মধ্যে দিয়ে দেশ আজ কলঙ্কমুক্ত। এত কিছু সত্ত্বেও মননে-চেতনে পাকিস্তানি ভাবধারার রাজনীতিবিদ, সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদগণ, মধ্যরাতের বুদ্ধিজীবীগণ মেতে উঠেছে নিত্যনতুন ষড়যন্ত্রে, কেননা তারা দেশের উন্নয়ন চায় না, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকুক তা চায় না। কিন্তু এই বিজয়ের মাসে এদেশের সাধারণ মানুষ সকল ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে নির্বাচনে ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ক্ষমতায় এনে দেশের উন্নয়নের গতিকে বেগবান করবে এটাই এই মহান বিজয় দিবসের প্রত্যাশা।
n লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
