একটি পতাকা জয়ের গল্প

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪১

বাংলাদেশের  স্বাধীনতা  অর্জনের ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। অনেক কষ্টের ফসল আমাদের এ স্বাধীনতা। ত্রিশ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত আর লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত এ স্বাধীনতা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্ম-প্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ ও ই.পি.আরকে হত্যা করে এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙালিদের তত্কালীন জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। মার্চের ৩ তারিখ পূর্ব ও পশ্চিম অংশের এই দুই নেতা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতিকে সঙ্গে নিয়ে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হন। তবে বৈঠক ফলপ্রসূ হয় না। মুজিব সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগেই বাস্তবায়নের জন্য চার দফা দাবি পেশ করেন:অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।/ সামরিক বাহিনীকে সেনানিবাসে ফিরে যেতে হবে।/ নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে।/ ২৫ মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তাঁর এই ভাষণ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্খায় উন্মাতাল করে তোলে।

মুক্তিবাহিনী তীব্র আক্রমণের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী সীমান্ত পোস্টগুলো একে একে দখল করে নিতে শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখতে দেখতে এত খারাপ হয়ে যায় যে, কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে ডিসেম্বরের ৩ তারিখ ভারতে আক্রমণ করে বসে। তখন পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ছিল হঠাত্ আক্রমণ করে ভারতের বিমান বাহিনীকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া। কিন্তু তারা সেটি করতে সক্ষম হয়নি। ভারত সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশে তার সেনাবাহিনী নিয়ে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের ভেতর তখন পাকিস্তানের পাঁচটি পদাতিক ডিভিশন। ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হবার পর সেটি চলে মাত্র ১৩ দিন। যুদ্ধ শুরু হবার পর পাকিস্তানের একটি একটি করে ঘাঁটির পতন হতে থাকে। যৌথবাহিনী তাদেরকে পাশ কাটিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততর গতিতে ঢাকার কাছাকাছি এসে হাজির হয়ে যায়। তারা ঢাকা ঘেরাও করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন।

বাঙালির জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের তাত্পর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি চূড়ান্তভাবে একটা স্বাধীন দেশ পায়। একটা স্বাধীনতা পায়। নিজেদের ন্যায্য অধিকার পায়। আজ আমরা যে একটা সুখী, সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল  ও মর্যাদাসম্পন্ন দেশ গড়তে চলেছি। যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। সহজভাবে বলতে গেলে আজকের আমাদের এ বাংলাদেশ উন্নতির যে ধাপগুলো স্পর্শ করেছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু করবে তার সঙ্গে মিশে থাকবে লাখ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার এক অসামান্য অবদান। সকল শহীদের প্রতি রইল আমার স্বশ্রদ্ধ সালাম।

n লেখক:শিক্ষার্থী, সরকারি এম এম কলেজ, যশোর