ফারুক সাহেব পেঁয়াজের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কীরে পেঁয়াজের হালি কত?’
মুদি দোকানদার হাসমত বিরস কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘একদাম ২০ টাকা।’ উত্তর শুনে ফারুক সাহেব যেই না বিড়বিড় করে বললেন, ‘চামারটা বলে কী?’ ওমনি হাসমত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমারে কিছু কইলেন চাচা?’
ফারুক সাহেব নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলেন, ‘চিন্তা কর ব্যাপারটা। অথচ বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন এক কেজি পেঁয়াজ পাওয়া যেত এই টাকায়। তাজা তাজা মাছ বাজারে আসার পর লাফাত। সেই লাফানো দেখে মাছ কিনতাম। আর এখন? কয় বছর আগের মরা মাছের সামনে মানুষ লাফায়। দরাদরি করে কে আগে কিনবে, সেই প্রতিযোগিতায়। আগে রাস্তার ধারে কচুশাক পড়ে থাকত, কেউ তুলে নিয়ে বাজারে বিক্রির জন্য আনত না। আর এখন কচুশাকের দাম শুনলে মনে হয়, কচু গাছে ফাঁস লাগিয়ে মরি। সবজির বাজারে আগুন জ্বলছে তো জ্বলছেই। একটু পর পর দুই লিটারের প্লাস্টিকের বোতলে বোতলে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভাচ্ছে সবজিওয়ালারা। দিন দিন কীভাবে জিনিসের দাম শুধু বেড়েই চলেছে, খেয়াল করেছিস?’
—হুম।
—হুম মানে কী কীরে?
—জিনিসের দাম বাড়তাছে।
—তুই কী জানিস, ষাট সালের দিকে ডালের দর ছিল চার আনা সের।
—কন কী, তখনও ডাইল ছিল?
—থাকবে না কেন? মুগ ডাল, মুসরির ডাল, মাসকালাইয়ের ডাল, বুটের ডাল, অরহরের ডাল, মটরের ডাল, খেসারির ডাল...
—ওরে খাইছে, আপনার কী ডাইলের ব্যবসা আছিল নাকি চাচা?
—কী?
—না মাইনে, মনে হইল আর কী। আমি অবশ্য অন্য ডাইলের কথা ভাবছিলাম। যাউক গা, কী যেন কইতেছিলেন?
—বলছিলাম, তখনকার দামের কথা। তখন কত অল্প টাকায় কত কিছু কেনা যেত, জানিস?
—জাইন্যা কী করুম?
—তা জানবি কেন? পড়ালেখা কিছু করছিস? করিস নাই। করলে তো জানবি। শোন, পড়ালেখা ছাড়া জীবন অচল।
—কী যে কন চাচা। আমি তো দেখি উল্টা। মালামাল বেইচাই কূল করতে পারি না। আর এদিকে পড়ালেখা জানা মাইয়া, পোলারা লাইন দিয়া খাড়াইয়া থাকে আমার দোকানে। কী কী মাল লাগব, সেই মালের সাপ্লাই দেওনের লাইগা। এখন আপনেই কন, এত জাইন্যা করুম কী?
—জেনে কী করবি মানে? দিন কে দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কি বেড়েই চলবে? এটা কি মগের মুল্লুক?
—কোন জিনিসের কত দাম ছিল, জানলে কী জিনিসের দাম কমব? তাইলে কন, এক্কেবারে শের শাহের আমল থিক্কা শুরু করেন।
—ফাজলামি করিস? এভাবে হু হু করে সব জিনিসের দাম বাড়লে চলবে?
—জি চাচা, চলবে। দেখতাছেন না, মানুষ লাইন ধইরা কিনতাছে। এই যে পেঁয়াইজের যত দাম বাড়তাছে, তত বেশি মানুষ কিনতাছে। আগে এমুন কিনত?
ফারুক সাহেব হিসাব মেলাতে পারছেন না। অনেক চেষ্টা করেও না। অর্থনীতির চাহিদাবিধির সূত্রানুসারে, দাম বাড়লে তো চাহিদা কমার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ‘অর্থনীতি’ অশিক্ষিত হাসমতের পক্ষ নিল কেন, কে জানে? যতই দাম বাড়ছে মানুষ হুড়মুড় করে উপচে পড়ছে হাসমতের দোকানে। ঘটনাটা কী?
