l সুমন্ত গুপ্ত
অফিস থেকে বাসায় ফিরছি, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা প্রায়। খুব ক্লান্ত লাগছে, আর মেজাজও খিটখিটা হয়ে আছে। রাস্তায় জ্যাম, উল্টো পথে একটি গাড়ি ঢুকার জন্য এ অবস্থা। কী আর করা, বসে থাকলাম রিকশায়। বিরক্তিকর সময় কাটানো জন্য মোবাইলে চোখ রাখলাম। নেটে পেলাম শত বছরের পুরোনো কাস্বাবটুলি জামে মসজিদের নাম। দেখেই একটু নড়েচড়ে বসলাম। ফোন দিলাম আমার ভাই পৃথুকে। নাম শুনে সে আকাশ থেকে পড়ল মনে হয়। বললাম, পুরান ঢাকায় রয়েছে এই মসজিদ। আবার নেট ঘাটতে লাগলাম। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকা কোষ’ গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মসজিদটির নির্মাণকাল ১৯০৭ সাল। নির্মাণ করেছিলেন আবদুল বারি নামক জনৈক ব্যবসায়ী। এটিকে অনেকে ‘চিনির টুকরা মসজিদ’ নামেও চেনে। মসজিদটির গায়ে চিনামাটির সাদা টুকরাগুলো দেখতে চিনির দানার মতো হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদটিকে এই নামে ডাকে। বেশ কিছু সময় গুগল লোকেশন ম্যাপ ঘাটতে ঘাটতে দেখা পেলাম কাস্বাবটুলি জামে মসজিদের। জ্যাম ঠেলে বাসায় এসে ঢুকলাম। ফ্রেস হয়েই পৃথুকে ফোন দিলাম, ‘চলো, আসছে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চিনির টুকরা মসজিদ দেখে আসি।’ সে সম্মতি দিলে যাওয়ার প্ল্যান করে ফেললাম। দেখতে দেখতে কাঙ্ক্ষিত দিন চলে এলো। আমি ও পৃথু বের হলাম নতুন গন্তব্য পানে। রিকশায় উঠে বসলাম। রিকশাওয়ালাকে বললাম কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ যাব। তিনি বললেন চেনেন না। আমরা বললাম, চেনার দরকার নেই, আগে আমরা কসাইটুলি যাই, পরে কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ খুঁজে পাওয়া যাবে। পুরান ঢাকার অলিগলি পার হয়ে চলেছি। যদিও রিকশার জটের কারণে সামনে এগিয়ে যাওয়াই দুষ্কর। মনে মনে ভাবছিলাম, এত প্যাঁচানো গলিতে প্রবেশ করেছি যে, ফিরতি পথে বের হওয়া কঠিনই হবে। পৃথু রাস্তার ধারের আরেক জনের কাছে জানতে চাইল, কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ কোথায়? তিনি বললেন, আরেকটু সামনেই গেলে দেখা পাবেন। তার কথামতো কিছু দূর যাওয়ার পরেই পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। চিনামাটির কারুকাজে মণ্ডিত মসজিদ। যদিও মসজিদটির সামনের অংশ ভ্যানগাড়ি দিয়ে অবরুদ্ধ। কাছে গিয়ে নকশার কাজ দেখছিলাম। অসাধারণ! মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলাম, কিন্তু প্রবেশ পথে তালা ঝুলানো। পাশের এক দোকানে জানতে চাইলাম, মসজিদের প্রবেশদ্বার কে কখন খুলবেন? আর তাকে পাবই বা কীভাবে? উত্তরে তিনি জানালেন, অল্পকিছু সময়ের মাঝেই চলে আসবেন ইমাম সাহেব। ভেতরের কারুকাজ দেখার জন্যই কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলো। কিছুক্ষণ পর মসজিদের ইমাম সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। ইমাম সাহেবকে জানালাম, আমরা ভেতরের কারুকাজ দেখাতে চাই। তিনি আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। শান্ত পরিবেশ। চোখ জুড়ানো স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন এই কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ। মোগল স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করে নির্মিত নান্দনিক নকশা-খচিত কাস্বাবটুলি মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে করা ‘চিনিটিকরির কারুকাজ’। চিনামাটির বর্ণিল টুকরো দিয়ে পুরো মসজিদটির নকশা করা হয়েছে। মূলভবনের ভেতর ও বাইরের দেয়ালসহ সম্পূর্ণ জায়গায় চিনিটিকরি পদ্ধতির মোজাইক দিয়ে দারুণ নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চিনামাটির ভাঙা টুকরা আর রঙিন কাচ দিয়ে গোলাপ ঝাড়, আঙুরের থোকা, ফুলদানির ছবি মসজিদের দেয়ালে-খিলানে দৃষ্টিনন্দন চিত্রের উপস্থাপন তৈরি করেছে। মসজিদের ভেতরের মিহরাব ও মিহরাবের আশপাশের নকশাগুলো সবচেয়ে রঙিন ও জমকালোভাবে তৈরি। মসজিদটির দেয়ালে আঁকা বিভিন্ন নকশা ছাড়াও রয়েছে চিনামাটির টুকরো দিয়ে করা ক্যালিগ্রাফি। আয়তাকার মসজিদটির ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। চার কোনায় রয়েছে চারটি বুরুজ। মসজিদটির সমতল কোনো ছাদ নেই। গম্বুজগুলোর উচ্চতা ৫-১২ ফুট। পদ্মফুলের নকশা করা তীর রয়েছে গম্বুজ আর বুরুজের মাথায়। ছাদের চারদিকে রয়েছে নকশা করা অনেকগুলো টারেট। মসজিদের নকশাকে এগুলো আরো আকর্ষণীয় করে তুলছে। আমরা প্রতিটি স্থান ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। কিছু সময় বসেও থাকলাম। একের পর এক ছবি তুলছি।
কীভাবে যাবেন : ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে বাবু বাজার ব্রিজ বা বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুতে আসতে হবে। এখান থেকে রিকশা নিয়ে যেতে হবে কাস্বাবটুলি জামে মসজিদে। হেঁটেও যাওয়া যায়। ‘কসাইটুলির চিনির মসজিদ’ বললে যে কেউ নিয়ে যাবে। ভাড়া নেবে মতিঝিল থেকে ৮০-১০০ টাকা।
