হবু মা ও বাচ্চার জন্য পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আয়রন,
ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের চাহিদা মেটানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। হবু মা প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে দৈনিক অন্তত চার লিটার পানি পানের পাশাপাশি ফলের জুস, স্যুপ, সরবত কিংবা ওরালস্যালাইন খেতে পারেন
একজন মেয়ে যখন প্রথম জানতে পারেন তার শরীরে বেড়ে উঠছে এক নবপ্রাণ ঠিক সেই মুহূর্তটার অনুভূতি অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে অসাধারণ। আর ঠিক তখন থেকে বাচ্চা প্রসবকালীন সময় এমনকি বাচ্চা প্রসবের পরবর্তী সময়টাতেও তিনি ধীরে ধীরে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশাল একটা মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। এসময়টাতে হবু মায়ের নিজের যত্নের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে বাড়তি যত্ন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। হবু মায়ের যত্ন সম্পর্কে জানিয়েছেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের সহযোগী অধ্যাপক ইনফারটিলিটি স্পেশালিস্ট অ্যান্ড ল্যাপারোস্কপিক সার্জন ড. সাইকা শহীদ।
একজন হবু মা তার প্রেগন্যান্সি বা গর্ভবতী হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ামাত্র কাছের গাইনি ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে দেখা করা উচিত। এরপর তার সঙ্গে কথা বলে কিংবা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা কেমন আছে সেটা জেনে ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী তাকে তার করণীয় সম্পর্কে জানাবেন। এরপর সেই চিকিত্সক কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীই তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন কিংবা সেই অনুযায়ী পরামর্শ দিবেন। প্রেগন্যান্সির সময়টাকে তিন ভাগে ভাগ করে একজন প্রেগন্যান্ট মায়ের সেবা বা যত্ন দেওয়া হয়। আর একেক ভাগে তিন মাস করে প্রথম এক-তিন মাসকে ফার্স্ট ট্রাইমিস্টার, চার-ছয় মাসকে সেকেন্ড ট্রাইমিস্টার, ৭-৯ মাসকে থার্ড ট্রাইমিস্টার হিসাব করা হয়। এই সময় বিবেচনা করেই এক ডাক্তার হবু মায়ের খাবার তালিকা, প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট, বিশ্রাম কিংবা চলাফেরার গতিবিধি সম্পর্কে জানিয়ে থাকেন।
প্রথম তিন মাস
গর্ভবতী মায়ের জন্য এই সময়টা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এসময়ে গড়ে প্রায় ৭-৮ শতাংশ মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য কারো কারো অত্যধিক বমি বমি ভাব কিংবা বমিও হতে পারে। ফলে শারীরিকভাবে দুর্বল অনুভব করা, মাথা ঘোরা, মাথা ব্যথা, অস্থিরতাসহ নানারকমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত বমির ফলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে বেশি করে পানি, ফলের রস, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন কিংবা স্যুপজাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত। অতিরিক্ত বমির ভাব বা বমি হলে ড্রাই ফুড বা শুষ্ক খাবার খাওয়া যেতে পারে। এতে বমির প্রবণতা কম হবে। কন্সিভ করার পর থেকেই হবু মায়ের গ্যাস্ট্রিকজাতীয় সমস্যা খুব বেড়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয় তিন মাস
একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য চার-ছয় মাস পর্যন্ত অর্থাত্ সেকেন্ড ট্রাইমিস্টার সময়টা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এই সময়ে হবু মা নিরাপদ পরিবহনে ঝুঁকিমুক্ত ট্রাভেল করতে পারেন। বিশেষ কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলে স্বামী-স্ত্রীর মিলনেও কোনো বাধা নেই। তবে এই সময়টা গর্ভের শিশুর দৈহিক গঠনের সময় বলে হবু মায়ের খাবারের তালিকায় কিছু বাড়তি খাবার যোগ করা আবশ্যক। দৈনিক ১২০০-১৫০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হবে। সাপ্লিমেন্ট হিসেবে মাকে ক্যালসিয়াম নিতে হতে পারে। আয়রন এবং প্রোটিনের চাহিদাও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। তাই সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া আবশ্যক।
তৃতীয় তিন মাস
এই সময়ে শারীরিকভাবে নিজেকে একটু ভারী মনে হতে পারে। প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগাটাও অস্বাভাবিক কিছু না। অনেকেরই শেষ সময়ে এসে নানারকম শারীরিক জটিলতা লক্ষ্য করা যায়। এজন্য নিজের শরীরের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। হবু শিশুর ব্যাপারে নানারকম দুশ্চিন্তা মনে উঁকি দেওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু না; কিন্তু নিজেকে শান্ত রাখার সার্বিক চেষ্টা থাকতে হবে। ঘুমের সমস্যা বা ঘুম কম হওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে।
অন্যান্য যত্ন
শুরুর দিকে খাবারের প্রতি অনীহা থাকতে পারে। তবে একটু একটু করে বারে বারে খাবার গ্রহণ করতে হবে। বাড়তি প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সামুদ্রিক মাছ, মিঠাপানির মাছ, মাংস, ডিম, দুধ এবং দুগ্ধজাতীয় খাবার খেতে হবে। কাঁচা ও তাজা রঙিন শাকসবজি, দেশীয় ফলমূল খেতে হবে। হবু মা ও বাচ্চার জন্য পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আয়রন, ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের চাহিদা মেটানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। হবু মা প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে দৈনিক অন্তত চার লিটার পানি পানের পাশাপাশি ফলের জুস, স্যুপ, সরবত কিংবা ওরালস্যালাইন খেতে পারেন। কোমর, হাঁটু বা শরীরের অন্যান্য স্থানে তেমন কোনো ব্যথা না থাকলে হবু মা স্বাভাবিক হাঁটাচলার পাশাপাশি, সাঁতার, ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এসময়ে নিজেকে ডেলিভারির জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।
যে কোনো রকম ভারী কাজ থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অনিরাপদ যানবাহন এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার পাঁচটি বিপজ্জনক চিহ্ন থেকে যে কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়ামাত্রই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে গর্ভবতী মা ও নবজাতশিশুর রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। তাই রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। রাত-বিরাতে প্রসবযন্ত্রণা হলে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য জরুরি পরিবহনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এছাড়া ইমারজেন্সি ফান্ড হিসেবে বেশ কিছু পরিমাণ টাকা সঞ্চয় রাখতে হবে যেন প্রসূতি মা অথবা শিশুর চিকিত্সার জন্য কাজে লাগতে পারে।
অনুলিখনঃ ফারিয়া মৌ
