দক্ষ তরুণসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৮

>> রাফসান বিন রাজ্জাক

 

কোচ কামরুল হাসান, বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে এক সুপরিচিত নাম। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রায় ১৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজের ‘কোচ কামরুল হাসান নেটওয়ার্ক’ (সিকেএইচ নেটওয়ার্ক)-এর বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশের ছাত্রসম্পদকে আগামী দিনে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী।

তিনি আগামী ৫ বছরে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে দক্ষ হিসাবে গড়ে তুলতে চান। কামরুল হাসান নিজেও একজন অদম্য যোদ্ধা। ঝিনাইদহের একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে হার্ভার্ড জয় করে ঠিকই ফিরে এসেছেন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কিছু করতে। তার নিজের জীবনের ঘটনা এবং বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে তার সিকেএইচ নেটওয়ার্কের কথা, ‘১৯৯৪ সালে মেট্রিক পরীক্ষা দিলাম। আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো রেজাল্ট হলো। ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় আসব। ঢাকা কলেজে পড়তে হবে। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কলেজে পড়তেই হবে। কিন্তু পরিবারের সবাই তো ঢাকায় আসবে না। তাই ঠিক হলো একাই আসতে হবে এবং একাই থাকতে হবে হোস্টেলে। ইচ্ছাশক্তি আর বিশ্বাসের কাছে হার মানল অন্যসব বাধা। সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় যাব।’

ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজে। শুরুটা ভালো হলেও ধীরে ধীরে জীবন বাঁক নিল। ১৭ বছরের কিশোর এবং উদ্দাম স্বাধীনতা মিলে যেটা হওয়া হয়তো অনেকটা স্বাভাবিক ছিল, সেটাই হলো। পড়াশোনা থেকে বিছিন্ন হয়ে গেলাম এবং ফলাফল দাঁড়াল ইন্টার পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট। মনে হলো খুব জোরে জীবনের প্রথম ধাক্কা খেলাম, ভর্তি হলাম বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে! শুরু হলো নিজের উপার্জনে পথচলা। ১৯৯৭ সালে এই ঢাকার রাস্তায় এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বিক্রি শুরু করলাম। গুলশানের সিগনালে বই বিক্রি শুরু হলো। কোনো কাজকেই আমি ছোট করে দেখিনি কোনোদিন। এখনো নিজের গাড়িতে করে চলার সময় কোনো কিশোর বয়সের কেউ বই বিক্রি করছে দেখলে এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে যাই। আমার ইচ্ছা শক্তি ও বিশ্বাসের বলে চাকরি পেয়ে গেলাম। মার্কেট এক্সেস নামের এক কোম্পানিতে পার্টটাইম হিসাবে যোগ দান করলাম। এর পরে যোগদান করলাম ভ্যানিকে, এখন লংকাবাংলা নামে যা সুপরিচিত। কাজ ঠিক হলো ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করা। এই কার্ড বিক্রি একদিন আমাকে পৌঁছে দিল এইচএসবিসি ব্যাংকের গুলশান ব্রাঞ্চের দরজায়। আমার কাজের দক্ষতা ও নিষ্ঠা দেখে সেখানকার ম্যানেজার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ আমাকে চাকরির অফার দিল। তখনো কিন্তু গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়নি। মনে হলো পৃথিবীজুড়ে আমার জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করছিল।

২০০১ সালে যোগদান করলাম এইচএসবিসি ব্যাংকে, তারপর আর থেমে থাকিনি কোনোদিন। গ্র্যাজুয়েশনের সময় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের রোডেই আমার ক্যম্পাস ছিল। পার্টটাইম চাকরি শেষে যখন ক্লাসে যাওয়ার আগে রাস্তার পাশের হোটেলে বসে খেতাম, দেখতাম ছেলেমেয়েরা গাড়িতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে। খুব ভাবতাম আমি কি কখনো নর্থ সাউথে এরকম গাড়ি নিয়ে আসতে পারব? ঠিক তখনই মনে হলো পারব না কেন? অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকলাম। ২০০০ সালে ঢাকার রাস্তায় বই বিক্রি করা আমি ২০০৬-তে নিজের গাড়ি কিনলাম এবং ভর্তি হলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ কোর্সে। গত ১৮ বছরে কাজ করেছি এইচএসবিসি, জেডটিই, এরিকসন, হুয়াউয়ে, ডুন এবং ব্র্যান্ডস্ট্রিট, ব্র্যাক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে। চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে পেলাম ব্র্যাক ব্যাংক চেয়ারম্যান এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড।’

কোচ কামরুল হাসান যোগ করলেন, ‘মালেয়শিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, লন্ডন, নেপাল, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ট্রেনিং নিয়েছি। রবিন শর্মা, জন ম্যাক্সোয়েল, মার্শাল গোল্ডস্মিথ, পল মারটেনলি, ড. পিটার চে, রঞ্জন ডি সিলভাসহ সাক্সেস ম্যাগাজিন খ্যাত ড্যারেন হার্ডির মতো পৃথিবী সেরা ট্রেনার থেকে ট্রেনিং নিয়েছি। বিশ্ববিখ্যাত জন ম্যাক্সওয়েলের থেকে পেলাম আন্তর্জাতিক বক্তা এবং কোচ সার্টিফিকেট। ২০১৭ সালে শুরু করলাম নিজের কোম্পানি। সেনসি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করলাম সেনসি উইজডোম। মজার ব্যাপার হলো,  যেই গুলশানের সিগন্যালে বই বিক্রি শুরু, যেই এইচএসবিসি ব্যাংকে আমার যাত্রা শুরু, এখন আমার নিজস্ব অফিস ঠিক তার উল্টোপাশেই। এখনো অফিসে আসার সময় এইচএসবিসি গুলশান ব্রাঞ্চ দেখলে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে যাই।’

ইচ্ছাশক্তি, বিশ্বাস এবং নিষ্ঠা কামরুল হাসানকে শিখিয়েছে জীবনে হার না মেনে প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলতে। সিকেএইচ নেটওয়ার্ক নিয়ে বর্তমানে তার কাজ আর ভাবনা জুড়ে রয়েছে এদেশের তরুণ প্রজন্ম। দক্ষ তরুণসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তিনি।