অভিনয়কে ভালোবেসে এ শিল্প মাধ্যমে যে কজন মানুষের দিনরাত্রির বসবাস, তাদের একজন অভিনয়শিল্পী জাহাঙ্গীর আলম। শিশু সংগঠনে শুরু করেছিলেন এ পথের যাত্রা আর এখন সারথি হয়েছেন প্রাচ্যনাটের। প্রাচ্যনাটের অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। কুড়িয়েছেন সুঅভিনেতার প্রশংসা। মঞ্চে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে প্রাচ্যনাটের ‘সার্কাস-সার্কাস’, ‘কইন্যা’, ‘রাজা এবং অন্যান্য’, ‘অ্যা ম্যান ফর অল সিজনস্’ এবং আগুন্তুক রেপার্টরির ‘অন্ধকারে মিথেন’, ‘ধলেশ্বরী অপেরা’। মঞ্চ ছাড়াও নিয়মিত অভিনয় করছেন টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে। তার প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র ‘দহন’। আর সম্প্রতি শেষ করলেন এইচবিও টিভি চ্যানেলের ছয় পর্বের ধারাবাহিক ‘ইনভিজিবল স্টোরিস’-এর কাজ। বহুমাত্রিক এই অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের অভিনয়ে ভিন্নতা আনতে অভিনেতার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
অভিনয়ে ভিন্নতা আনা খুব কঠিন একটা কাজ। আমার মনে হয়, প্রথমেই যেটা করা উচিত, সেটা হলো চরিত্র নির্বাচনে সচেতন থাকা। একই ধরনের চরিত্র যেন না হয়ে যায়। চরিত্রের ভিন্নতা আনতে হলে আমাদের স্বাভাবিক জীবনের চারপাশের বিভিন্ন চরিত্র দেখতে হবে। তাদের প্রতিদিনের জীবনাচার খেয়াল করতে হবে। তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। নিজের উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। এর জন্য গল্প উপন্যাস পড়ার কোনো বিকল্প নেই, যেখানে অনেক চরিত্রের সন্ধান মিলে। অনেক পড়া থাকলে নিজের চিন্তাশক্তি দিয়ে সেই চরিত্রগুলোকে তৈরি করা যায়। তবে আমার মনে হয়, অভিনেতা যে চরিত্রে অভিনয় করবে, সে চরিত্রের অতীত-বর্তমান নিয়ে ভাবতে হবে। সেই চরিত্রটি হয়ে যেতে হবে। সর্বোপরি অভিনয়ের চর্চার মধ্যে থাকতে হবে।
মঞ্চে অভিনয় একজন অভিনেতাকে কিভাবে অন্য মাধ্যমগুলোতে ভালো অভিনয় করতে সাহায্য করে?
মঞ্চে অভিনয় করতে হলে থিয়েটার করতে হবে। আর থিয়েটার এমন একটা মাধ্যম, যেখানে শিল্পকলার সবগুলো শাখার ব্যবহার হয়। প্রতিদিনের থিয়েটার চর্চায় একজন অভিনেতা যেমন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে, তেমনি শিল্পকলার অন্যান্য শাখা যেমন—গান, নাচ, উচ্চারণ, থিয়েটার গেমস, বিভিন্ন ইম্প্রোভাইজেশনের মাধ্যমে নিজের অভিনয় প্রতিভাকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে। সর্বোপরি, নিয়মানুবর্তিতার একটা শিক্ষা সে থিয়েটার থেকে পেয়ে যায়। ফলে একজন থিয়েটারের অভিনেতা যখন অন্য মাধ্যমগুলো, যেমন নাটক-সিনেমায় কাজ করতে যায়, তখন তাকে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। কারণ প্রতিদিনের থিয়েটার চর্চায় সে চরিত্র নির্মাণের কৌশলগুলো শিখে যায়।
এখন অনেক ছেলেমেয়েরাই মঞ্চে অভিনয় করতে আগ্রহী হয় না। এর কারণ কী বলে মনে হয়?
আমার সে রকম মনে হয় না। কারণ আমরা যখন থিয়েটার শুরু করি, তখন ঢাকায় যে ক’টা থিয়েটারের দল ছিল, এখনো সে দলগুলো আছে। উপরন্তু, ঢাকায় এখন অনেক রেপার্টরি থিয়েটার হয়েছে, যা আগে ছিল একটা বা দুইটা। এই নতুন দলগুলো সবাই নতুন নতুন কাজ করছে। ছেলেমেয়েরা আগ্রহী না হলে কিন্তু এটা সম্ভব হতো না। এর পাশাপাশি অভিনয় প্রশিক্ষণের স্কুল চালু হয়েছে কয়েকটা, যা আগে ছিল মাত্র একটা এবং নতুন নতুন অনেক ছেলেমেয়েরা আসছে থিয়েটার করতে। আমাদের স্কুল প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইনিংয়ে বছরে দুটি সার্টিফিকেট কোর্স হয়।
মঞ্চ, টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রে কোন ধরনের কাজ অভিনেতার আগ্রহের কারণ হতে পারে?
একটা আন্তর্জাতিক মানের কাজই একজন অভিনেতার আগ্রহের কারণ হতে পারে। আমি জুলাই মাসে সেরকম একটি কাজ করতে গিয়েছিলাম সিঙ্গাপুরে। ‘ইনভিজিবল স্টোরিস’ নামে এইচবিও টিভি চ্যানেলের একটা ছয় পর্বের ধারাবাহিক সিরিজের এক পর্বে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়। সিঙ্গাপুরে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের না-বলা না-জানা গল্প নিয়ে এই সিরিজটি সাজানো হয়েছে। পরিচালক ছিলেন লার জুইয়ান। আমাকে এখানে অনেকগুলো ভাষায় (বাংলা, ইংলিশ, ইন্দোনেশিয়ান) সংলাপ দিতে হয়। অনেক দেশের শিল্পীরা ছিলেন এই সিরিজটাতে। এখানে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যতক্ষণ পর্যন্ত অভিনেতা মানসিকভাবে তৈরি না হয়, ততক্ষণ তাকে সময় দেওয়া হয়। খুব সিস্টেমেটিক্যালি তারা কাজটি করে। আসলে অভিনেতাকে কাজের জন্য মানসিকভাবে তৈরি হওয়া খুব জরুরি। আমারও মনে হয়েছে এ ধরনের কাজই একজন অভিনেতার আগ্রহের কারণ হতে পারে। এ কাজটা আমার একটা নতুন অভিজ্ঞতা। অনেক কিছু শিখেছি এখান থেকে।
অভিনেতার মানসিক ভাবে সমৃদ্ধ হতে কী কী করা দরকার হয়?
একজন অভিনেতার মানসিকভাবে সমৃদ্ধ হতে হলে তার পরিবারের সাপোর্ট সবার আগে প্রয়োজন। তারপর চর্চার একটা বিষয় তো আছেই। ২৪ ঘণ্টা থিয়েটারের কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে; সেটা হোক অভিনয়, সেট ডিজাইন বা অন্যকিছু। প্রচুর সিনেমা দেখতে হবে, গান শুনতে হবে, পেইন্টিং, স্কাল্পচারের প্রদর্শনী দেখতে হবে, বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপে যোগ দিতে হবে জোরে জোরে শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে হবে, বই পড়তে হবে।
