আইন না মেনেই এনআইডি বাধ্যতামূলক করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৫০

আইনে না থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নাগরিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ব্যবহার একপ্রকার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিখিতভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনও বাধ্যতামূলক। এর ফলে যাদের কাছে এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা যায়, আইন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। আইনে বলা আছে এনআইডির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যাবে না। এমন কি যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান পরিচয়পত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে তাদেরকে এর আগে একাধিকবার চিঠি দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করেছে ইসি। কিন্তু কেউই তা মানছে না।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, আইন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান এনআইডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সেই সিদ্ধান্তের বিষয়ে জনগণ চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটি আর ভোটার সাড়ে ১০ কোটির মতো। এর মধ্যে সবার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। সূত্রমতে, প্রায় ৭ কোটি মানুষের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে চাকরি, ব্যবসা প্রভৃতি কাজে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি সংযুক্ত করতে বলে। দেখা যাচ্ছে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের কাছেই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। এর ফলে বিপাকে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে পাসপোর্ট তৈরি, মোবাইলের সিম কেনা, ভিসার আবেদন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে আবেদন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানি, বেসরকারি ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অন্যের অ্যাকাউন্টের চেক নিয়ে টাকা তুলতে গেলেও ব্যাংকে গ্রহীতার    কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি রাখা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন কাজে চাওয়া হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র। কোথায়, কোন্ ক্ষেত্রে এই পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই তার পড়ছেন ভোগান্তিতে।

নির্বাচন কমিশন বলছে, অধিকাংশ ব্যাংকে নতুন হিসাব খোলা বা ঋণ বিতরণ ইত্যাদি কাজে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না রেখেই জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন বা এর অনুলিপি দাখিলের শর্তারোপ করা হচ্ছে। তাছাড়া পাসপোর্ট অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে নাগরিকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এজন্য ব্যাংকে হিসাব খোলা বা পরিচালনা করা বা ঋণ গ্রহণ অথবা বিভিন্ন সংস্থা/দপ্তর সেবা প্রদান সংক্রান্ত কোনো কাজে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন বা এর অনুলিপি দাখিলের বিষয়টি এ সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তি না হওয়া পর্যন্ত বাধ্যতামূলক না করার জন্য এর আগে অনুরোধ করা হয়েছে।

২০১০ সালে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন এবং তদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধানাবলি প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইনের ১১ ধারায় বলা আছে:‘সরকার, সরকারি গেজেটে এবং তদতিরিক্ত ঐচ্ছিকভাবে ইলেকট্রনিক গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উহাতে উল্লিখিত যে কোনো সেবা বা নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে, নাগরিকগণকে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন ও উহার অনুলিপি দাখিলের ব্যবস্থা চালু করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, বাংলাদেশের সমগ্র এলাকায় নাগরিকগণের অনুকূলে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এইরূপ প্রজ্ঞাপন জারি বা ব্যবস্থা চালু করা যাইবে না। (২) উপ-ধারা (১) এর অধীন প্রজ্ঞাপন জারি না করা পর্যন্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন কিংবা ক্ষেত্রমত, জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি দাখিল করিবার জন্য কোনো নাগরিককে বাধ্য করা যাইবে না এবং জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকিবার কারণে কোনো নাগরিককে নাগরিক সুবিধা বা সেবা পাইবার অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।’

এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (অপারেশন্স) পরিচালক মো.আবদুল বাতেন ইত্তেফাককে বলেন, যেহেতু দেশের সমস্ত নাগরিককে এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়নি সেহেতু এটির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা আইনসম্মত নয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়নি। কোনোভাবেই এর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যাবে না।