গল্পের গরু গাছে

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৮

মুহাম্মদ বরকত আলী

সাদিয়া ওর দাদুর কাছে বায়না ধরেছে গরু গাছে ওঠে কীভাবে তা বলতে হবে। কোথা থেকে শুনে এসেছে গরু নাকি গাছে ওঠে। তাও আবার গল্পের গরু। কিন্তু কীভাবে? দাদুর হাত ধরে একটা নাড়া দিয়ে সাদিয়া বলল, ‘ও দাদু, বলো না গরু গাছে ওঠে কীভাবে?’

দাদু বললেন, ‘গরু গাছে ওঠে। নিশ্চয় গরু গাছে ওঠে। তবে সব গরু গাছে উঠতে পারে না। শুধু গল্পের গরু গাছে ওঠে।’

সাদিয়া বলল, ‘বলো না দাদু, গল্পের গরু গাছে ওঠে কীভাবে?’

দাদু একটু নড়ে চড়ে বসে বললেন, ‘তাহলে শোন, তখন আমি তোমার মতো ছোট ছিলাম। আমার দাদুকে ঠিক তোমার মতো করে বললাম, ও দাদু, বলো না গল্পের গরু গাছে ওঠে কীভাবে? দাদু বড়ো করে একটা শ্বাস টেনে বললেন, ‘হ্যাঁ রে, একটা গরু একবার গাছে উঠেছিল। তখন আমি ছোট। তোমার বয়সের। সকালবেলা ইশকুলে যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। ঠিক তখনই দেখি—আমাদের দুটো ষাঁড়গরুর মধ্যে একটা ষাঁড় কখন যে কাঁঠাল গাছে উঠে বসে বসে পাতা চিবাচ্ছে তা কেউ খেয়ালই করেনি। আমি দেখেছিলাম। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, গরু গাছে উঠেছে, দেখ গরু গাছে উঠেছে! আমার চিত্কার শুনে বাবা এল, মা এল, রাখাল এল।’

সাদিয়া আরো কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘তারপর কী হলো দাদু?’

দাদু বললেন, ‘বলছি বলছি। সবুর করো।’

দাদু আবার বলতে শুরু করলেন, ‘দাদুর বাবা এসে বলেন, হায় হায়, গরু উঠেছে গাছে। এই গরু নেমে আয়, নেমে আয় গরুর বাচ্চা গরু। গরু নামে না।’ গরু নেমে আসে না। মনের সুখে পাতা চিবাচ্ছে।’ 

দাদুর মা এসে বলেন, ‘এই গরু নেমে আয়, নেমে আয় বলছি। তোর জন্য ভাতের মাড় রেখেছি খাবি আয়।’

তবুও গরু নামে না।

রাখাল বলে, ‘আয় আয় নেমে আয় বলছি। তোর জন্য কাঁচা সবুজ ঘাস এনেছি খাবি আয়।’ গরু নামে না।

সাদিয়া বলল, ‘ও দাদু, তা না-হয় বুঝলাম, কিন্তু গরু গাছে উঠল কী করে?’

দাদু বললেন, ‘বলছি বলছি। আমার দাদু তোমার মতো ছোট ছিল, তাই দাদু জিজ্ঞেস করল, মা, ও মা, বাবা, ও বাবা, গরু গাছে উঠল কীভাবে?’

দাদুর মা বললেন, ‘তা-ই তো, গরু গাছে উঠল কীভাবে?’

দাদুর বাবা বললেন, ‘কীভাবে উঠল?’

রাখাল বলল, ‘তা-ই তো, গরু গাছে উঠল কেমন করে?’

আমার দাদু ছিলেন খুব বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমান কেন জানো তো? দাদু ইশকুলে যেতেন। অনেক অনেক বই পড়তেন। অজানা বিষয় জানার খুব আগ্রহ ছিল। তাই দাদু তখন বললেন, ‘মই, মই বেয়েই উঠেছে। মই গাছে লাগানো ছিল। আমি দেখেছি। দড়ি খুলে দিয়ে রাখাল যখন লাঙল-জোয়াল নিতে গেছে ঠিক তখনই গরুটা মই বেয়ে সুযোগ বুঝে গাছে উঠেছে। যখন রাখাল মইটা গাছ থেকে নিয়ে মাঠের দিকে যাবে, ঠিক তখনই আমি দেখি গরু গাছে উঠে বসে পাতা খাচ্ছে।’

দাদুর মা বললেন, ‘গরু এখন নামবে কীভাবে?’

দাদুর বাবা বললেন, ‘হায় হায়, কীভাবে নামবে?’

রাখাল বলল, ‘তা-ই তো নামবে কীভাবে?’

দাদু বললেন, ‘মই লাগাও, গাছে মই লাগাও।’

মই লাগানো হলো গাছে। বাবা বলেন, নেমে আয়। মা বলেন, নেমে আয়। তবুও গরু নামে না। রাখাল বলে, নেমে আয়। তবুও গরু নামে না। এখন কী হবে? দাদু মই দেখিয়ে বললেন, ‘ও গরু, তুমি না গল্পের গরু? নেমে এসো গল্পের গরু।’ ঠিক তখনই গরুটা গাছ থেকে নেমে এল মই বেয়ে। গাছ থেকে নেমেই মাঠের দিকে দে দৌড়। সেইদিন থেকেই গ্রামে গ্রামে, দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল, ‘গল্পের গরু গাছে ওঠে।’

সাদিয়া বলল, ‘দাদু, তাহলে কি সত্যি সত্যি গরু গাছে ওঠে?’

দাদু বলেন, ‘হ্যাঁ, ওঠে তো। আমার দাদুর কাছ থেকে শুনেছি বলেই তো তোমাকে বললাম।’

সাদিয়া আবারও বলে, ‘ও দাদু, তুমি সত্যি করে বলো না, গরু কি সত্যিই গাছে উঠতে পারে?’

দাদু এবার জোর দিয়ে বললেন, ‘ওঠেই তো। তবে গাছে মই লাগিয়ে দিতে হয়। তাহলেই গল্পের গরু গাছে উঠবে। মই না পেলে গরু উঠবে কীভাবে?’

সাদিয়া হাতে তালি দেয় আর বলে, ‘কী মজা, কী মজা, গল্পের গরু গাছে ওঠে।’