আমাদের প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহতায়ালা রহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অর্থাত্ সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য যিনি রহমত। তার পবিত্র আদর্শে আমরা দেখতে পাই সমগ্র সৃষ্টির প্রতি কল্যাণকামিতার অনন্য নজির। পরোপকার বা ইহসান হচ্ছে মহত্ গুণ। সব সৃষ্টি জীবের প্রতি দয়া, অনুগ্রহ ও অনুকম্পা প্রদর্শনের নামই হচ্ছে ইহসান। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি পরোপকার করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন’—(সুরা কাসাস ২৮:৭৭)। আল্লাহতায়ালা কোরআনুল কারিমে আরো বলেন, ‘তোমরা সত্কাজ করো, নিশ্চয় আল্লাহ সত্কর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (২:১৯৫)। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তোমরা জগদ্বাসীর ওপর দয়া করো, তাহলে মহান আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করবেন।’
খেদমতে খালক তথা সৃষ্টির সেবার গুরুত্বের প্রতি তাগিদ দিয়ে হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে: শেষবিচারের দিন আল্লাহ তার কোনো বান্দাকে লক্ষ্য করে বলবেন, ‘আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে খাদ্য দাওনি। আমি পিপাসার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে পানি পান করাওনি; আমি পীড়িত ছিলাম, তুমি আমার সেবা-শুশ্রূষা করোনি।’— এ কথা শুনে বান্দা অবাক হয়ে আরজ করবে, ‘হে প্রভু! তুমি অভাবমুক্ত। কেমন করে তুমি ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত এবং পীড়িত হতে পারো?’ উত্তরে আল্লাহ বলবেন: ‘আমার অমুক বান্দা পিপাসার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে উপস্থিত হয়েছিল, তুমি তাকে খাদ্য ও পানীয় দাওনি। যদি দিতে, তুমি আমাকে সেখানে পেতে। তোমার জানা উচিত ছিল, আমার বান্দার সেবা করলে আমারই সেবা করা হতো এবং আমি তাতেই সন্তুষ্ট।’
সুফিদের জীবনে খেদমতে খালক বা সৃষ্টির সেবা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। তারা ভালোবাসার শক্তিতে মানুষের হূদয়ের স্থান লাভ করেন। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবার বিপদে তারা পরম মমতায় পাশে দাঁড়ান। তারাই প্রকৃত ইনসানে কামিল। হাসিদে এসেছে, ‘ঈমানদার হলো ভালোবাসার কেন্দ্রস্থল। তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে অন্যকে ভালোবাসে না এবং অন্যরাও তাকে ভালোবাসে না।’ (মেশকাত শরিফ)।
খাজা গরিবে নেওয়াজ মইনুদ্দিন চিশতি (রহ) ও হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনি (রহ)-এর আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরি যুগশ্রেষ্ঠ সুফি শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ) খেদমতে খালক তথা ‘সৃষ্টির সেবা’ দীক্ষার মহান দিশারি। জানা যায়, চাঁদপুর ফরাযীকান্দীর উয়েসিয়া শরিফের পির ইমামমুত তরিকত সুফি শায়খ মুহাম্মাদ বোরহানুদ্দীন (রহ)-এর পূর্বপূরুষ হযরত শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হিসেবে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর দক্ষিণ আরব থেকে বাংলাদেশে হিযরত করেন। পরবর্তীকালে ফরাযীকান্দী নামক গ্রামে বসতি স্থাপন করে অত্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার, সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ অবদান রাখেন। শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ)-এর পিতা মাওলানা আফাজুদ্দিন (রহ)-ও ছিলেন আধ্যাত্মিক কামেল ব্যক্তিত্ব। শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ) ১৯৪৩ সালে ছতুরা শরিফের পির প্রফেসর আব্দুল খালেক (রহ)-এর দাস্ত মুবারকে বায়াত গ্রহণ করেন। প্রফেসর সাহেব ছিলেন শাহ সুফি ছদর উদ্দিন আহমাদ শহিদ (রহ) ও ফুরফুরা শরিফের আলা হযরত মুজাদ্দেদে জামান আবু বকর সিদ্দিকী (রহ) উভয়েরই খলিফা।
মহিয়ে সুন্নাহ ও সাচ্চা আশিকে রাসুল শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ) ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আল্লাহর ওলি। তিনি ছিলেন মানবদরদি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তিনি সবার কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তিনি শুধু সুফিদের মহান আদর্শ খেদমতে খালক তথা সৃষ্টির সেবাকে নিজের জীবনে ধারণ করেননি বরং সৃষ্টির সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সফল রূপকার। ‘সৃষ্টির সেবাই স্রষ্টার সেবা’—এই আদর্শ বাস্তবায়নে তিনি ১৯৪৯ সালে নেদায়ে ইসলাম নামক একটি সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যার আওতায় প্রায় ২০টির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তারই ধারাবাহিকতায় নেদায়ে ইসলাম পরবর্তীকালে দেশ-বিদেশে বহু দ্বিনি সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।
‘ইলম’ বা জ্ঞান হচ্ছে মহাশক্তি। এই সত্যটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন শায়খ বোরহানুদ্দীন (রহ)। তিনি দ্বিনি শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায় পারদর্শী হতে গুরুত্ব দিতেন। তিনি ১৯৪৯ সালে ফরাযীকান্দীতে উয়েসিয়া আলিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করে অত্র অঞ্চলে নিরক্ষরতা দূর করে আলোর সন্ধান দিয়েছেন। এই ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাটি বর্তমানে কামিল পর্যায়ে উন্নীত। তিনি স্বীয় পির সাহেবের নামে ‘পির প্রফেসর আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল লাইব্রেরি’ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া নেদায়ে ইসলামের উদ্যোগে পরবর্তীকালে ভোলা, মেহেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছতুরা শরিফ, কসবা, সোনারগাঁও ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় পাঠাগার গড়ে ওঠে।
এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বিভিন্ন জায়গায় নেদায়ে ইসলাম আলিয়া, ফাদ্বিল মহিলা মাদ্রাসা, বোরহানুল উলুম হাফেজিয়া মাদ্রাসা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, নেদায়ে ইসলাম কিন্ডারগার্টেন, জামে মসজিদ ইত্যাদি গড়ে ওঠে।
সমাজে অবহেলিত নিঃস্ব অসহায় এতিমদের আশ্রয়, শিক্ষা দান এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি ১৯৫২ সালে আল আমীন এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে নেদায়ে ইসলাম ও খলিফাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানাগুলোর মধ্যে ঢাকায় নেদায়ে ইসলাম এতিমখানা, ছালাম আবাদ আল আমিন এতিমখানা, দিনাজপুরে সিরাজাম মুনিরা এতিমখানা, হাশিমপুরের সায়্যিদুল মুরসালিন এতিমখাানা, নেদায়ে ইসলাম এতিমখানা, ফেনীর পরশুরাম, মেহেদীপুর ও দাগনভূইয়া, নবীনগর, যশোর, নারায়ণগঞ্জ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
তিনি ১৯৫৬ সালে জিলানিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এতে এতিমদের দ্বিনি শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যেমন—(ক) তাঁত ও বয়নশিল্প, (খ) চামড়া প্রক্রিয়াজাত শিক্ষা, (গ) রং ও ছাপাশিল্প, (ঘ) দর্জিশিল্প, (ঙ) কাঠশিল্প, (চ) প্রাথমিক কৃষিবিজ্ঞান, (ছ) বৈদ্যুতিক কাজ, সাঁটলিপি ইত্যাদি। ১৯৬০ সালে খাজা গরিব নেওয়াজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নতমানের চিকিত্সা নিশ্চিত করে সৃষ্টির সেবার এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন; যা এক মহাবিপ্লব। এর ধারাবাহিকতায় নেদায়ে ইসলামের মাধ্যমে এই চিকিত্সা সেবা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রংপুর, ঝিনাইদহ, ফেনী, কুমিল্লা ইত্যাদি জায়গায় নেদায়ে ইসলাম সেবা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। হোমিও চিকিত্সার জন্য খ্যাতি লাভ করায় উথলী, চুয়াডাঙ্গায় নেদায়ে ইসলাম ফ্রাইডে ফ্রি ক্লিনিকে সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ থেকেও রোগীরা চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করতে আসে।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ) আন্তর্জাতিক মানের আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শায়খ মানযূর আহমাদ (রহ) নেদায়ে ইসলামের একুশতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৬৫ সালে ঢাকা মহানগরীর প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ‘শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
দেশ, জাতি ও সমাজকল্যাণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর ১৯৮১-৮২ সালে নেদায়ে ইসলামকে জাতীয় সংস্থা হিসেবে সনদ প্রদান করে। সুফি বোরহানুদ্দীন (রহ) ১৯৬৪ সালে ৯ মে (২৭ জিলহজ রাতে) ৫১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার মাজার শরিফ চাঁদপুর উয়েসিয়া শরিফ ফরাযীকান্দী কমপ্লেক্সে অবস্থিত।
লেখক :পির সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরিফ, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ
