বাধাকে জয় করার বড় মন্ত্র হচ্ছে ইচ্ছা। ইচ্্ছাটাকে যে যত বেশি জাগ্রত করতে পারবে সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে জ্বলন্ত উদাহরণ সিলেটের
জয়িতারা। তৃণমূল সংগ্রামী নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর জীবনযুুদ্ধে
জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী
আশ্বিনের স্নিগ্ধ দুপুরে একেকজন জয়িতার কষ্টের গল্প যেন ঝরছিল চোখের জলে। আর বুকে যেন চাপা পড়া পাথর অনুভব হচ্ছিল দর্শক, শ্রোতা ও উদ্যোক্তাদের। তখন অনেকের মনে হয় ইস্পাত কঠিন সদিচ্ছার কাছে কিছুই বাধা নয়। বাধাকে জয় করার বড় মন্ত্র হচ্ছে ইচ্ছা। ইচ্্ছাটাকে যে যত বেশি জাগ্রত করতে পারবে সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে জ্বলন্ত উদাহরণ সিলেটের জয়িতারা। তৃণমূল সংগ্রামী নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর জীবনযুুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বেশ কয়েক বছর থেকে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতাদের জাঁকজমক সম্মাননা প্রদানের জন্য সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সিলেট নগরীর কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
আসমা উল হাসনা খান
বেগম রোকেয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত আসমা উল হাসনা। তিনি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। ছোটবেলা হতেই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রামে নামতে হয়েছে তাকে। পিতার তেমন আয়-রোজগার না থাকায় অভাব-অনটনের মধ্যদিয়ে তাদের দিন কাটত। তার বাবা জীবিকার তাগিদে তাদেরকে নিয়ে সিলেট শহরে চলে আসেন। সংসারের নানা অভাব-অনটনের মধ্যদিয়ে অনেক কষ্ট করে আসমা উল হাসনা খান এস.এস.সি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তিনি ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, সিলেট হতে একবছর মেয়াদী দর্জি বিজ্ঞান ট্রেডে প্রশিক্ষণ নেন। তখনকার সময়ে সিলেটের নারীরা যখন ঘর থেকে তেমন একটা বের হতো না তখন তীব্র নিন্দা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে নানীর কাছ থেকে পাওয়া মাত্র এক হাজার চারশ’ টাকা পুঁজি নিয়ে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে বাসায় মহিলাদের দর্জির দোকান খোলেন। এতে তিনি ন্যায্য মূল্য পেতেন না। পরবর্তীতে অনেক কষ্ট করে ছোট একটি লেডিস টেইলার্স শপ খুলেন। কিছুদিন পর সেলাই ও কাটিং-এর উপর উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই চালু করেন মহিলাদের জন্য সেলাই ও কাটিং-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় দেড় শতাধিক নারীদের সেলাই ও কাটিং-এর উপর প্রশিক্ষণ দেন আসমা উল হাসনা। তার প্রতিষ্ঠানে অনেক হতদরিদ্র মহিলাকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে তার টেইলার্স হতে যে উপার্জন হতো তার থেকে কিছু টাকা জমিয়ে আরেকটি দোকান দেন সিলেট প্লাজায়। আসমা সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স-এর একজন সম্মানিত সদস্য। ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে তিনি সম্মাননা অর্জন করেছেন অনেক। যার মধ্যে রয়েছে বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী স্মৃতিপদক, মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক ও শেরে বাংলা শান্তিপদক, ২০১২ সালে তার বোন সাবরিনা খানের সাথে যৌথভাবে পেয়েছিলেন সেরা রাঁধুনি অ্যাওয়ার্ড।
হাসনা বেগম
তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ভালো চিকিত্সক হবেন। লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন বলে স্কুলের শিক্ষকরা খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু মানুষের বাস্তব জীবন যে এত নির্মম, এত কঠিন তার উদাহরণের একটি অংশ হলো তার জীবন। কোনোদিন ভাবতেই পারেননি যে, তার জীবনটা তার স্বপ্নের সম্পূর্ণ বিপরীত হবে। স্বপ্ন ছিল এসএসসি-তে এ+ পেয়ে উত্তীর্ণ হবেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষার সর্বশেষ পরীক্ষার দিন হঠাত্ তার বাবা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার লাশ ঘরে রেখেই তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। বাবার হঠাত্ মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে খুবই আঘাত করে।
২০০৯ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ৩.১০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। প্রাইভেট ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর পাশাপাশি ডিগ্রিতে ভর্তি হন তিনি। এদিকে ২০১০ সালে নারী শিশু আদালতে শ্বশুরবাড়ির লোকদের উপর নারী নির্যাতন মামলা করেন তিনি যার মামলা নং নারী শিশু ৪১/১০ প্রতিবেদন রিপোর্ট তার পক্ষে যাওয়ার কারণে আসামিদের ওপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। উক্ত মামলায় শ্বশুর ১৪ দিন জেল খেটে হাইকোর্টের জামিনে বের হয়ে যান। অর্থের অভাবে মামলা পরিচালনা করতে পারেননি বলে এখন পর্যন্ত মামলা চলমান অবস্থায় আছে। ২০১২ সালে বি.এস.এস পরীক্ষায় ২য় বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে সিলেট এমসি কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞান ফাইনাল পর্বে আছেন।
রিপা বেগম
২০১১ সালে নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফ্রন্ট ডেক্স অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি তার চাকরির পাশাপাশি ব্যবসাও চালিয়ে যান। ২০১৪ সালে রুপসী বাংলা লেডিস টেইলার্স এন্ড বুটিকস-২ প্রতিষ্ঠা করেন। একদিন অর্থের অভাবে তার পড়ালেখা বন্ধ হতে চলেছিল। আজ তিনি নিজে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকরি ও ব্যবসা করছেন এবং তার ভাই-বোনদেরকেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন। তিনি একজন অ্যাডভোকেট হিসেবে সিলেট বারেও প্রাক্টিস করছেন সফলতার সাথে। তার বহুমুখি প্রতিভার জন্য তার এলাকার সকলেই তাকে এক নামে চিনেন এবং এলাকার নারীরা তাকে অনুসরণ করে সাফল্য অর্জন করতে চান।
ইন্দ্রানী সেন
১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও ভাই-বোনদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে বিধায় তিনি ঢাকায় না গিয়ে এম.সি কলেজে দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করাকালীন সময়ে সিলেট সদর উপজেলার বালুচর চন্দন টিলার ওয়ার্ড আদিবাসী জনগোষ্ঠী তত্কালীন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কর্তৃক ভূমি দখলের শিকার হলে তিনি আদিবাসীদের ভূমি রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেন। তিনি বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক ও সিলেট জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নারীর সমঅধিকার অর্জনের লড়াই-এ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। যখন কোনো নারী পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে তখনই তিনি তাদের পাশে থেকে আইনি সহায়তা ও নির্যাতনের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন।
বীনা রানী রায়
নিজের দুটি অবুঝ সন্তানকে দুবেলা দুমুঠো অন্ন যোগানোর যুদ্ধ শুরু হয়। শুরু হয় তার জীবনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে তার পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন বেশ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় যা তাকে মনের দিকে সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনযুদ্ধ হয়তো আমরা অনেকেই দেখি ছায়াছবিতে। কিন্তু তার যুদ্ধ ছিল বাস্তব যুদ্ধ। বৃষ্টির দিনে টিনের চাল দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়তো। মাঝে একদিন এমন হয়েছিল ঝড়ে টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে সারারাত ছেলে দুটিকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ছিলেন তিনি। মনে মনে ভাবতেন কবে শেষ হবে এই দুঃখের দিন। বাড়িতে বিশুদ্ধ পানির টিউবওয়েল ছিল না।
শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। চিন্তা করলেন ছেলেদের দিয়ে আর দোকান চালাবেন না। আমি নিজেই সেলাই কাজ করে সংসারের খরচ ও ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ চালাব। যখন সম্ভব হচ্ছিল না, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন নরসিংদী থেকে কাপড় এনে বিক্রি করবেন। সমস্যা হলো টাকা। কোথায় পাবেন টাকা। তখন তার পাশের বাড়ির এক সুহূদয় মহিলা তাকে দিলেন ৫০০০/- টাকা এবং তার দীর্ঘদিনের জমানো ৫০০০/- টাকা দিয়ে নরসিংদী থেকে কাপড় কিনে আনলেন। এবার শুরু হলো প্রকৃত যুদ্ধ। ব্যবসা করে ধার পরিশোধ করে আবার ধার নিতেন। এভাবে চলতে লাগলো তার কাপড় বিক্রি ও সেলাইয়ের কাজ। কিছুদিন পর হঠাত্ আবার তার স্বামী আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের অনুরোধে ফিরে আসতে চাইলেন। সকলের আশীর্বাদে তিনি এখন স্বাবলম্বী ও সফল জননী।
