গৃহ শিশুশ্রমে
নিয়োজিত শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি জানার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করা জরুরি। সরকার ঘোষিত শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকায় গৃহ শিশুশ্রম অন্তর্ভুক্ত করতে
হবে
ছাইফুল ইসলাম মাছুম
শিশু অধিকার নিয়ে সরকারি বেসরকারি অনেক সংস্থা সোচ্চার হলেও, শিশু গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে কেউ সরব নয়। তাদের নিয়ে নেই সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও। সরকার শিশু শ্রমিকদের ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পেশার তালিকা করলেও, সেখানে ঠাঁই মেলেনি শিশু গৃহকর্মী পেশার।
অথচ এই শিশু গৃহকর্মীরা পারিবার থেকে বহু দূরে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ওদের সোনালি শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে চার দেয়ালে মাঝে। অন্য শিশু শ্রমিকদের কাজের নির্দিষ্ট ঘণ্টা থাকলেও শিশু গৃহকর্মীদের কাজের কোনো সময় ঘণ্টা নেই। অন্যদের কাজের ক্ষেত্র দৃশ্যমান হলেও, শিশু গৃহকর্মীদের কাজের ক্ষেত্র দৃশ্যমান নয়। পত্রিকার পাতা খুললে চোখে পড়ে শিশু গৃহকর্মীদের প্রতি অমানবিক আচরণ, বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হত্যা, কিংবা আত্মহত্যার ঘটনার সংবাদ।
মানবধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শিশু সনদে লেখা রয়েছে প্রতিটি শিশুর লেখাপড়ার অধিকার রয়েছে, বিশ্রামের অধিকার রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে শিশু গৃহকর্মীদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার ঘোষিত গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি (২০১৫) অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োজিত করা যাবে না। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুকর্মীদের বের করে আনার জন্য যে অঙ্গীকার করছে, সেটা যেন বাস্তবায়ন হয় প্রত্যাশা করছি।’
টেরেডেস হোমস নেদারল্যান্ডস-এর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (চাইল্ড প্রটেকশন) এহসানুল হক বলেন, ‘শিশু গৃহকর্মীদের নিয়ে কারো পর্যবেক্ষণ নেই, তাদের সুরক্ষার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই। শিশু গৃহকর্মীদের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করে তাদের সুরক্ষায় কাজ করা জরুরি।’
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) পরিচালিত এক জরিপে (২০০৬ সালে) বাংলাদেশে শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা বলা হয়েছে ৪,২০,০০০। শিশু গৃহকর্মীর প্রায় ৮১ ভাগ মেয়ে শিশু। জরিপে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীতে শিশু গৃহকর্মীর বড় অংশ কাজ করছে। প্রায় এক দশক আগে পরিচালিত এই জরিপের পরিসংখ্যান গৃহ শিশুশ্রম সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। এমনকি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার সার্ভে ২০১৩-এ গৃহ শিশুশ্রম সম্পর্কে কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।
২০১০ সালে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) দ্বারা ঢাকা মহানগরীতে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, গৃহ শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের মধ্যে শতকরা ৭৮ ভাগ মেয়ে শিশু।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) কর্তৃক শিশু গৃহকর্মীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ১০টি শহরে ১২০০ শিশু গৃহকর্মীর উপর পরিচালিত (ঢাকা বাদে) গবেষণায় দেখা যায়, গৃহ শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের মধ্যে শতকরা ৮৩ ভাগ মেয়ে শিশু। এক তৃতীয়াংশ নিরক্ষর। শতকরা ৫০ ভাগ মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। বেশির ভাগ শিশু পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে শ্রমে নিযুক্ত হয়েছে। ১২% শিশু অভিভাবকহীন, ২৪% এর কেবল মা আছে এবং ৮% এর কেবল বাবা আছে। ৭.৫% শিশু কোনো বেতন পায় না, কেবল খাবার, কাপড়-চোপড় ও থাকার বিনিময়ে কাজ করে। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের মাসিক গড় বেতন ১২৬৭ টাকা, তিন চতুর্থাংশ শিশুর বেতন অভিভাক গ্রহণ করে ( ৪৪% মা এবং ১৯% বাবা)। প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিশু কাজ করার সময় আঘাতপ্রাপ্ত বা জখম হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। ৮০% শিশু ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করে। ৫৩.৭% শিশু শারীরিক এবং ৫৭% শিশু মানসিক শাস্তির কথা উল্লেখ করেছে, বয়স্ক শিশুরা বেশি শাস্তি ভোগ করে। প্রায় ৫০ ভাগ শিশু তাদের প্রতি খারাপ আচরণের কথা উল্লেখ করেছে। শতকরা ২০ ভাগ মেয়ে শিশু যৌন হয়রানির (খারাপ ঈঙ্গিত, কু-প্রস্তাব, শরীর স্পর্শ) কথা উল্লেখ করেছে। ৬১% ‘শিশু অধিকার’ সম্পর্কে কিছুই শোনেনি, যারা শুনেছে তারা টিভিতে বা বিদ্যালয়ে শুনেছে।
গৃহ শিশুকর্মীদের অধিকার সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ বলেন, ‘গৃহ শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি জানার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করা জরুরি। সরকার ঘোষিত শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকায় গৃহ শিশুশ্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫ পর্যালোচনা এবং এর সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করার জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
ছবি: ইন্টারনেট
