ডায়াবেটিস নিয়ে পৃথিবী জুড়ে যারা জীবনযাপন করছেন তাদের জীবনের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে সারা বিশ্বে চলছে নানা আয়োজন। এই অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর আহার। ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নে একে বলা হচ্ছে মূল চাবিকাঠি।
স্বাস্থ্যকর আহার করলে দুটো সুফল:
lটাইপ ২ ডায়াবেটিসের সূচনা প্রতিরোধ করতে সহায়ক হবে।
lসব ধরনের ডায়াবেটিসের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং জটিলতা এড়াতে যে কার্যক্রম-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্বাস্থ্যকর আহার।এ কাজ করতে গিয়ে কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন উদ্যোক্তারা-
lস্বাস্থ্যকর খাবার সবার কাছে সহজলভ্য করে তোলা নিশ্চিত করা যায় কীভাবে? কোন কোন স্বাস্থ্যকর খাবার টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সহায়ক হবে।
lকোন স্বাস্থ্যকর খাবার সব ধরনের ডায়াবেটিস কার্যকর ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে। ডায়াবেটিস যে হারে বাড়ছে সারা পৃথিবীতে, এমন ধারা চলতে থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ে বেঁচে থাকবে ৬০০ মিলিয়ন মানুষ।
lস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করলে টাইপ২ ডায়াবেটিস ৭০ শতাংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব, স্বাস্থ্যকর আহার কমায় ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
lতাই জীবনে পরিবর্তন আনার এই তো সময়। সব ধরনের ডায়াবেটিসকে মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো স্বাস্থ্যকর আহার।
lআগামী পৃথিবীকেও তাই বদলে দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর আহার আসুক সবার আওতায়।
lডায়াবেটিস থাকলে তা আগাম চিহ্নিত করা খুবই প্রয়োজন। রোগ নির্ণয়ে দেরি হওয়া মানে টাইপ ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত অনেক মানুষ রোগ চিহ্নিত হওয়ার মুহূর্তে আবিষ্কার করবে যে, তারা এক বা একাধিক জটিলতার এরই মধ্যে শিকার হয়ে গেছে।
lস্বাস্থ্যকর আহার মানে পত্রবহুল সবজি, শাক, টাটকা ফল, হোলগ্রেন, কচি মাংস, মাছ, চিনিছাড়া দধি এবং বাদাম, ডাল এসব খেলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে এবং ডায়াবেটিসের জটিলতার সম্ভাবনা অনেক কমে।
lকিছু লোকের হতে পারে টাইপ-১ ডায়াবেটিস। টাইপ ১ ডায়াবেটিস প্রতরোধ না করে গেলেও রোগের কার্যকর মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
lশিশু ও কিশোরদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর আহারের অভ্যাস উত্সাহিত করা হলো ডায়াবেটিস মহামারি আকারে বেড়ে যাওয়া রোধের বড়ো উপায়। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা গেলে, টেকসাই উন্নয়নের পথে যাত্রাপথ হবে সুগম। স্বাস্থ্যকর খাদ্য হবে সুলভ ও সাশ্রয়ী, যত বেশি সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যকর খাদ্য মানুষের আওতার মধ্যে আসবে, ডায়াবেটিসের বড়ো বোঝার ভার অনেক লঘু হবে। ২০১৪ সালে ৩৮৭ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ডায়াবেটিসের এই বড় বোঝাকে যদি কার্যকর উপায়ে কমানো না যায় তাহলে এমন অনুমান, ২০৩৫ সালে তা হয়ে দাঁড়াবে ৬০০ মিলিয়ন। ডায়াবেটিস চিকিত্সা ও এর জটিলতা মোকাবিলার জন্য অর্থ ব্যয় হবে ৬১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রতিরোধ করলে বিশ্বের প্রতিটি দেশের স্বাস্থ্য পরিচর্যায় ব্যয়ের ১১ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। কেবল স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের এই কৌশল অবলম্বন করলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ৭০ শতাংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এদিকে ডায়াবেটিস ক্রমে বাড়তে থাকবে নিম্ন আয় ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে, টেকসই উন্নয়নের পথে তা বড়ো প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে। খাদ্যের ব্যাপারে কেমন পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্বের খ্যাতিসম্পন্ন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞরা। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় ও কমায় এমন সব খাদ্য চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় এমন সব শর্করা হলো-মিলে ছাঁটা সাদা চাল, ময়দা ও আলু, চর্বি ও আমিষের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত মাংস, লাল গোস্ত। এছাড়া মিষ্টি, ফলের রস, কোমল পানীয়। এছাড়া ফাস্টফুড ও হাইক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার খেলেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। টাইপ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় এমন খাদ্য হলো- লাল চাল, আটা, পপকর্ন পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, বাদাম, পত্রবহুল সবুজ শাকসবজি, টাটকা ফল, চিনিছাড়া দধি, চা মেডিটারিয়ান ডায়েট বেশ উপযোগী মনে করা হয়।
কীভাবে স্বাস্থ্যকর আহার করে ঝুঁকি কমানো যাবে ডায়াবেটিসের-
lফলের রস, সোডা, কোমল পানীয়ের বদলে বেছে নিতে হবে বিশুদ্ধ খাবার পানি, চিনি ছাড়া চা ও কফি।
lদিনে অন্তত: ফলের তিনটিসার্ভিং। সবজির তিনটি সার্ভিং। একটি সার্ভিং মানে ধরা যাক একটি ছোটো আপেল বা অর্ধেক কাপ কাঁচা সবজি বা ফল বা
একটি বড়ো কমলা বা এক বাটি পত্রবহুল শাক-সবজি বা একটি কলা, বা একটি ছোটো ক্যাপসিকাম। অর্ধেক কাপ জাম বা আঙ্গুর। রান্না করা আধা কাপ স্কোয়াশ। পত্রবহুল শাক সবজি প্রতিদিন খাওয়া যায়। সে সঙ্গে টাটকা মৌসুমি ফল।
lনাস্তার জন্য একমুঠ বাদাম বা এক টুকরা তাজা ফল বা মিষ্টি ছাড়া দধি।
lছাল ও চর্বি ছাড়ানো কচি মাংস, পোলট্রি, মাছ বা সি ফুড।প্রক্রিয়াজাত গোশত ও রেডিমিট পরিহার করা ভালো। খেলেও দু’এক টুকরা, উত্সবে কদাচিত্।
lচকোলেট বা জ্যামজেলির বদলে পিনাট বাটার।
lময়দার রুটির বদলে লাল আটার রুটি, সাদা চালের বদলে ব্রাউন রাইস।
lআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট সামান্য। জলপাইতেল, ক্যানোলা তেল, কর্নতেল, রাইসব্রান তেল। মাখন, ঘি, ডালডা, প্রাণিজ চর্বি, নারকেল তেল বাদ দেওয়া ভালো, খেলেও কদাচিত্। এমন খাবার খেলে ডায়াবেটিস থাকলেও তা থাকবে সুনিয়ন্ত্রণে।
nঅধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা
