বাজারে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেল ফারুক। একটা দোকানের সামনে বেশ ভিড়। হুড়োহুড়ি চলছে। ‘কী হয়েছে ভাই?’ একজনের কাছে জানতে চাইল ও।
‘জানি না ভাই। খুব দামি কিছু বিক্রি হচ্ছে মনে হয়।’
‘কী বিক্রি হচ্ছে?’ আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল ফারুক।
‘সত্যি জানি না ভাই। টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখি কী কিনতে পারি।’ হতাশ সুরে বলল লোকটি।
এমন সময় ভিড় ঠেলে বেড়িয়ে এলো একজন। চেঁচিয়ে বলল, ‘পাইছি! পাইছি!’
হাত উঠিয়ে ধরে থাকা টোপলা দেখাল সে।
‘ভাই, এটা কী? পোলাওয়ের চাল?’ জানতে চাইল ফারুক।
লোকটা আপাদমস্তক পরিমাপ করল ওকে। ‘ভাই, আপনি কোন দেশে থাকেন?’
‘না মানে! জানি না তো। তাই জানতে চাইলাম।’
‘লবণ! এটা লবণ। সারাদেশে লবণের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। লবণ নেই। দাম বাড়ছে হু হু করে। তাই যে যত পারছে লবণ কিনে রাখছে। আমিও দুই কেজি কিনে রাখলাম। পারলে আপনিও নিয়ে রাখেন।’
‘কত করে কেজি ?’
‘দুইশ করে তো নিল। ঘণ্টা দুয়েক পরে মনে হয় পাঁচশ করে কিনতে হবে।’
চিন্তিতভাবে বাজারে প্রবেশ করল ফারুক। মেসের জন্য বাজার করতে এসেছে ও। এভাবে যদি প্রতিদিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে তাহলে মেসে থেকে এইচএসসি পাস করাই কঠিন হয়ে যাবে ওর মতো অনেক ছাত্রছাত্রীদের জন্য।
সুমির কথা মনে পড়ল ওর। একই স্কুল থেকে এই শহরে এসেছে ওরা। যদিও আলাদা কলেজে ভর্তি হয়েছে ওরা, থাকে একই পাড়ার মেসে।
দেখা হলেই বলবে, ‘ফারুক তুই তো এটা আগেই জেনেছিস তাহলে আমাকে এটা বললি না কেন’ বা ‘তুই এটা আমার জন্য করলি না কেন?’
কথাটা অবশ্য ঠিক না। ফারুক সবসময়ই সুমির কথা ভাবে। পছন্দও করে। সুযোগ পেলেই ওর জন্য এটা-ওটা করে।
এই তো কয়েকদিন আগে ফারুক সুমিকে বলেছিল, ‘তোর জন্য একটা উপহার এনেছি। কাউকে বলবি না তো?’
‘কী এনেছিস? ফুল?’
জবাবে সুমির হাতে চারটি পেঁয়াজ তুলে দিয়েছিল ও। ‘গ্রামের হাটে কম দামে পেলাম। তাই তোর জন্য নিয়ে এলাম।’
‘কত নিল?’ জানতে চেয়েছিল সুমি।
‘বিশ টাকা।’ কম করে বলেছিল ফারুক। আসলে দাম পড়েছিল পঞ্চাশ টাকা।
‘তুই আমাকে আরো কয়েকটা পেঁয়াজ এনে দিতে পারবি?’
‘কেন? পেঁয়াজগুলো কি খুব টেস্টি ছিল?’
‘আরে না। আমাদের মেসের এক বড় আপুর কাছে পেঁয়াজগুলো ত্রিশ টাকায় বিক্রি করেছি। দশ টাকা লাভ করেছি। ভালো করেছি না?’
‘ভাই, পারলে লবণ কিনে রাখেন। ভালো করবেন।’ দোকানদারের কথায় বর্তমানে ফিরে এলো ফারুক।
মেসের বাজারের টাকায় লবণ কেনা সম্ভব না। নিজের টাকায় সুমির জন্য লবণ কিনল এক কেজি।
ঠিক করল এবার আর ফ্রি দেবে না। বাজার থেকে নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে এটাই তো ঢের। কাল যদি ঠিকই লবণ পাঁচশ টাকা বিক্রি হয়, তাহলে কম দামে লবণ কিনে দেওয়াটাই হলো প্রকৃত ভালোবাসার পরিচায়ক, ভাবল ও। এটাই এখনকার যুগের নুনের মতো ভালোবাসা।
সুমিকে মেসে পেল না। সেও মেসের অন্য মেয়েদের সঙ্গে বাজারে গেছে।
ঘণ্টাখানেক পরে ওকে কল করল সুমি। ‘আমি কি তোর কাছে লবণ চেয়েছিলাম? মেসে সবাই হাসাহাসি করছে।’
‘হাসাহাসির কী আছে! লবণের দাম বেড়েছে, তাই তোর জন্য এক কেজি কিনে এনেছি। তুই আমাকে দুইশ টাকা দিয়ে দিস। তাহলেই কেউ আর কিছু বলবে না।’
‘দুইশ!’ আকাশ থেকে পড়ল সুমি।
‘এই দামেই তো কিনলাম।’
‘লাগবে না আমার ঐ লবণ। তোর চেয়ে আমার কুদ্দুস ভাই-ই ভালো।’
‘কুদ্দুস! এটা আবার কে?’
‘আমরা যে দোকান থেকে মসলা-টসলা কিনি সেই দোকানের মালিক। ব্যাচেলর। আমাকে খুব ভালোবাসে। তুই লবণ দিয়ে যাওয়ার আগেই উনি আমাকে দুই প্যাকেট লবণ দিয়ে গেছেন। একদম ফ্রি। বুঝলি।’
