মশা মারতে কামান স্যাটেলাইট

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৫৯

 

পাঁচ বছর ধরে হাসপাতালের স্পেশাল কেয়ার অব নিউ বর্নে (এসসিএএনইউ) নিবিড়ভাবে কাজ করে গেলেও আয়া থেকে মায়া অন্যকিছু হতে পারেনি। দায়িত্বশীল ডাক্তার, নার্স স্ব-স্ব চেম্বারে ঘুমিয়ে পড়লেও যে ক’জন আয়া আছে, তাদের ঘুমানোর সুযোগ নেই। ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়। রাতভর অক্সিজেন, স্যালাইন, ওষুধ চলে। একজন ইন্টার্নি চিকিত্সক প্রেসক্রিপশন দেখে বলে দেয়, কখন কী ওষুধ দিতে হবে। কোনো শিশু গুরুতর অসুস্থ হলে ডাক্তার সাহেব হাই তুলতে তুলতে আসেন। চোখ ডলে কিছুক্ষণ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখে ওষুধ লিখে দেন। চব্বিশ ঘণ্টা নবজাতক শিশুর আপনজন মশার ঝাঁকের মতো বাইরে অপেক্ষমাণ। তাদের ডেকে ওষুধের কথা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হয়। সিনিয়র নার্স আয়েশা ম্যাডাম প্রতিদিন রাত ১টার সময় ডাকবেন। সম্ভবত ১টা বাজার পর তিনি আর চোখ খোলা রাখতে পারেন না। তার কমন বাক্য, ‘আর চোখ মেলে থাকতে পারছি না।’ মাঝে মাঝে রাগ হলেও মায়া কিছু বলতে পারে না।

—মায়া, খুব মশা বেড়েছে।

—জি ম্যাডাম। সারাবছর বাড়ছে। মশার আসলে কোনো সিজন নাই। বারোমাসী ফলের মতো বারোমাসী মশা।

—ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এখনো রোগী আছে। কে জানে কোন মশাটা ওখান থেকে কাকে কামড়িয়ে এসেছে।

—ইয়েস ম্যাডাম।

—মশা দেখে এখনো বোঝার উপায় নেই, কোনটা ঠিক কতটা বিষাক্ত।

—ম্যাডাম ডেঙ্গু রোগীদের গায়ে আঠা জাতীয় কড়া রং লাগিয়ে দেওয়া উচিত।

—কেন!

—তাহলে কামড় দেয়া মশার গায়ে রং লেগে থাকত। আমরা চিনতে পারতাম।

সিনিয়র নার্স আয়েশা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতো ভাব নিয়ে বললেন, ‘মানুষের যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে চুপ থাকা উচিত।’

মায়া চুপ করে থাকে। আয়েশা ম্যাডাম বলেন, ‘যাও কয়েলের ব্যবস্থা কর। মশার উত্পাতে ঘুমাতে পারছি না।’ মায়া বেরিয়ে যায়। নিচে দোকান থেকে কয়েল নিয়ে আসে। হাসপাতালে দিনরাত নেই। প্রতিনিয়ত রোগী নিয়ে মানুষের ছোটাছুটি। রোগাক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট সময় থাকলে মানুষেরও ছোটাছুটির একটা নির্দিষ্ট সময় থাকত। কয়েল নিয়ে উপরে ওঠার সময় পেছন থেকে একজন ডাকেন, ‘ম্যাডাম।’ মায়া ডাক শুনে দাঁড়িয়ে যায়।

—আমি হাসান। তিনতলায় ডায়রিয়ার রোগী আছে।

—ভালো।

—ভালো না। স্যালাইনে কাজ হচ্ছে না। একপাশ দিয়ে স্যালাইন যাচ্ছে, অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। বের হওয়া স্যালাইনে ভীষণ দুর্গন্ধ।

—অপ্রয়োজনীয? কথা বলা ভালো না।

প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে হাসান প্রশ্ন করে, ‘কয়েল নিয়ে কোথায় যান?’

মায়া কিছুটা চমকে উঠলেও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে, ‘তা দিয়ে আপনার কী দরকার?’

—আমারই তো কয়েল দরকার। সারারাত বাইরে দিয়ে ঘোরাফেরা। মশার সাথে ক’দিনে বিরাট খাতির হয়ে গেছে। রাত-বিরাতে ঝগড়াঝাটিও হয়।

মায়া কথা না বাড়িয়ে সোজা হেঁটে চলে আসে। হাসান আসে তার পেছন পেছন। চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষমাণ উদ্বিগ্ন মানুষের সঙ্গে বসে থাকে। একটু পরেই একজন বলে উঠল, ‘সিগারেটের গন্ধ আসে কোথা হতে? হাসপাতালে মানুষ সিগারেট খায়!’

হাসান বলল, ‘সিগারেট না কয়েলের গন্ধ।’ কাচের ঘরের ভেতর কয়েল জ্বলছে। হাসানের কথা শেষ হতে দেরি, উদ্বিগ্ন জনতার উত্তেজিত হতে দেরি হয় না। জটলা পাকায়। হাসান সবার সামনে নেতাদের মতো বক্তব্য দেওয়া শুরু করল, ‘সংগ্রামী বন্ধুরা আমার, ভেতরে যিনি কয়েল নিয়েছেন ওনার নাম মায়া। আসলে নাম মায়া হলেও ওনার ভেতর দয়ামায়া কিছু নেই। নবজাতক শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ভেতর মশার কয়েল জ্বালিয়ে তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এটা চলতে দেওয়া যায় না।’

সবাই সমস্বরে বলল, ‘ঠিক ঠিক।’ হাসপাতাল এখন অনেকটা উত্তপ্ত রাজনৈতিক ময়দানের মতো। থমথমে পরিস্থিতি। বিরোধী পক্ষের সঙ্গে যেকোনো সময় সংঘর্ষ বেঁধে যাবে! চিত্কার চেঁচামেচি শুনে ডাক্তার সাহেব, মায়া, আয়েশা বেগমসহ বেশ কয়েকজন গেটের সামনে জড়ো হয়েছে। ভয়ে গেট খুলছে না। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘আপনারা আমার কথা শুনুন।’

উত্তেজিত জনতার চিত্কার, ‘না, কোনো কথা নেই। বিচার চাই। আমাদের সন্তানদের জীবন নিয়ে খেলা করছেন। সবার বিচার হবে।’

ডাক্তার সাহেব মিনমিন করে বললেন, ‘ভাইসব, মশা কিন্তু আজ আর মশা নেই।’

একজন বলল, ‘মশা নেই মানে! মশা কি বাঘ-সিংহ হয়েছে?’

—তার চেয়েও বেশি। সাপ, বিচ্ছু, হায়েনা—কী আছে, যার সাথে মশার হিংস্রতার তুলনা চলে।

আরেকজন ডাক্তারকে ধমকে বললেন, ‘থামেন। যেখানে শিশুর পিতামাতা পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না। জুতা খুলে, পা মুছে, ওয়াশ রুমে হাত পা ধুয়ে তারপর যেতে হয়; সেখানে আপনারা কয়েল জ্বালিয়ে গোটা পরিবেশ বিষাক্ত করবেন, সেটা কেমন কথা? মশা যদি দু-একটা থাকে তো সেগুলো মারার বিকল্প পদ্ধতি বের করতে হবে।’

কিছু লোকজন হুড়মুড় করে গেটের দিকে ছুটে যায়। ডাক্তার সাহেব ভয়ে কিছুটা পেছনে সরে আতঙ্কিত গলায় বললেন, ‘আপনারা শান্ত হোন। কামান, ড্রোন সব ফেল। সম্প্রতি নাসা আমেরিকার কয়েকটি রাজ্যে মশা নিধনে স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে যাচ্ছে। মশা কমে যাবে, থাকবে না। কয়েলও জ্বলবে না।’

বয়স্ক একজন বলল, ‘স্যাটেলাইট কী?’

তার পাশে দাঁড়িয়ে আরেকজন বলল, ‘লাইটের মতো কিছু হবে।’

—মশা কি লাইটের রক্ত খাওয়া শুরু করেছে?

উত্তেজিত জনতা মানে হলো সাগরের ঢেউ। থামতে চায় না। কেউ একজন চিত্কার দিল, এই যে ডাক্তার সাব মশা মারতে কামান, ড্রোন, স্যাটেলাইট! যুদ্ধ বিমান, ক্রুজ মিসাইল, অ্যাটম বোমা এগুলো বাদ রাখছেন কেন? ফাজলামো     করেন...’