কথায় আছে, বাস্তবে নেই!

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০৯

 

 

প্রতিদিন আমরা এমন কিছু কথা বলি, খুঁজলে যার বাস্তব কোনো ভিত্তি পাওয়া যাবে না! তাই বলে ‘অবাস্তব’ কথাগুলোকে কেউ ভুল হিসেবে আখ্যায়িতও করে না। দেখা যাক, আমরা কী বলি—বাস্তবতার সঙ্গে তার কতটুকু দূরত্ব!

কানাকড়িও নেই...

প্রচণ্ড অর্থ সংকটের অবস্থা বোঝাতে অনেকেই বলে থাকেন, পকেটে নাকি কানাকড়িটিও নেই! কানাকড়ি না থাকায় অর্থ সংকট যেন আরো প্রকট আকার পায়। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, কানাকড়ি থাকলেও সমস্যা দূর হতো? কথা হলো, এখন কানাকড়ি পরের কথা, ভালো কড়িরও কোনো মূল্য নেই। মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে কড়ি পেরিয়ে টাকার যুগে প্রবেশ করেছি আমরা অনেক আগেই। টাকার যুগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার ইউরো পাউন্ডের সংস্কৃতি।

সবচেয়ে বড় কথা, কানাকড়ি তো কানা, এই কড়ি থাকলেও লাভ কী? ন্যাতানো দুই টাকার নোট না হয় চলে, বিকল্প নেই বলে! তাই বলে কানাকড়ির প্রতিও মানুষ সহানুভূতি কে দেখাবে! ডলার ইউরো পাউন্ডের যুগে আর কত কানাকড়ির গল্প শোনাবে কাঁচা গল্পবাজরা!

 

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া...

ঘোরতর বিপদে আমরা বলি, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। আসলেই কি মানুষের মাথায় ভেঙে পড়তে পারে! একজন মানুষকে ‘শায়েস্তা’ করতে আকাশ কেন এতটা তত্পরতা চালাবে? তারচেয়ে স্ব-স্থানে বসে নির্দিষ্ট মানুষটির মাথায় একটি বাজ ফেললেই তো কেল্লাফতে! আকাশ যখন ভেঙে পড়বে, নিশ্চয়ই শুধু একজনের মাথায় পড়বে না, পৃথিবীর সব মানুষেরই খবর হয়ে যাবে! কেউ নিশ্চয়ই এই দাবি করবে না, তার মাথা আকাশ-সমান— দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে। সুতরাং মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার গল্পটি মোটেও সত্য নয়।

গাছের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় শুকনো ডাল ভেঙে মাথায় পড়তে পারে, কাক তার অব্যর্থ প্র্যাকটিস চালাতে পারে, দুষ্টু গোছের ছেলেরা দুই একটা ঢিল ছুঁড়তে পারে, বৃষ্টির দিনে ছাতাহীন অবস্থায় বের হলে পানি পড়তে পারে—এসবই মাথায় পড়া সম্ভব! কিন্তু আকাশের কী এমন দায়; ক্ষুদ্র একজন মানুষকে ‘মহিমান্বিত’ করতে তার উপর নিজের সমস্ত শরীর চাপিয়ে দিতে হবে!

 

আঙুল ফুলে কলাগাছ...

সহজেই যারা অর্থবিত্ত, প্রভাবপ্রতিপত্তিশালী হয়ে যায়, তাদের আমরা বলি— আঙুল ফুলে কলাগাছ। টাকাটা বৈধ পথে আসুক কিংবা অবৈধ পথে। যুক্তিবাদীরা বলবেন, কলাগাছের সঙ্গে থোড়ের সম্পর্ক থাকতে পারে, কলা কিংবা ডাটির (যে অংশ তরকারি হিসাবে ব্যবহূত হয়) সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু টাকা আসবে কোত্থেকে, কেনই বা আসবে?

আঙুল ফুলে ঢোল হতে পারে কিন্তু কলাগাছ হবে কিভাবে? মাটি ছাড়া গাছ হয় না—এই তত্ত্বটুকু দিতে উদ্ভিদবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যেখানে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক নেই, সেখানে কিভাবে গাছ জন্মাবে! বনসাইয়েরও তো একটা বাহন থাকে! কারো আঙুল ফুলে যদি সত্যিই কলাগাছ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কলার চাষ করেন না! বেকার তরুণদের দেখিয়ে দেন না আঙুলে কিভাবে কলাগাছ রোপণ করতে হয়!

 

দম ফেলারও সময় নেই...

মানুষ সদা ব্যস্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কেউ সত্যিকার অর্থে আর কেউ বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে। ব্যস্ততা এবং ব্যস্ততার রকম জনে জনে ভিন্ন। ফাঁকিবাজ অফিসার চিন্তা করে বসের আসার সময় হয়েছে এখন ব্যস্ততার ভান না করলেই নয়! আবার কেউ কেউ কোনো কাজই তো হয়নি, বসকে কী জবাব দেবে ভেবে ব্যস্ত হয়। রোমিও টাইপ ছেলেরা ব্যস্ত থাকে স্কুল-কলেজের সামনে। প্রেমিকরা ব্যস্ত থাকে পার্কে কিংবা ছাত্রীহলের গেটে।

মোদ্দা কথা, যার প্রাণ আছে তার ব্যস্ততাও আছে। সেটা কাজে হোক আর অকাজেই হোক; অর্থকরী কিংবা অনর্থকরী—যাই হোক না কেন। কিন্তু ব্যস্ত মানুষের দম ফেলার সময় থাকবে না, এটা কি যুক্তির কথা? দম ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? সবচেয়ে বড় বিষয়, মানুষকে তো স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে দম নিতে হয় না। ওটা ‘ডিফল্ট’। তাহলে দম নেওয়ার সময় নেই—এটা কি সর্বৈব মিথ্যাচারিতা নয়!

 

এক ফোঁটা ঘুম...

নানা কারণে মানুষ বিনিদ্র রাত যাপন করতে পারে। কেউ বিনিদ্র রাত কাটায় পরদিন পরীক্ষা, পরীক্ষার খাতায় কী লিখবে, কলম দিয়ে লিখবে নাকি পেন্সিল দিয়ে লিখবে এই চিন্তায়; প্রেমিক টাইপের ছেলেমেয়েরা মোবাইল ফোনে একে অন্যের সঙ্গে কুহু কুহু করে, আর নিরাপত্তা প্রহরীরা বাসা-বাড়ি এবং অফিসের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হয়ে রাতের বেলায় সজাগ থাকে। নিশাচরী প্রাণীরাও রাত জাগে, নইলে তাদের নামের মানও থাকে না! কবি রাত জেগে কবিতা লেখে, তার কারণ কাব্যদেবী নাকি রাতে বিহারে বের হন। আরাধনারত অবস্থায় কবিকে দেখলে অলক্ষে বর দিয়ে যান। এই বর পেলে যে কোনো কবি রাতারাতি কাব্যতীর্থের তুঙ্গে অবস্থান করতে সক্ষম হন। জনপ্রিয়তা তথা দেবীর বরের জন্য হলেও কবিরা রাতজাগা প্রাণী।

কেউ যদি বলে কাল রাতে আমার চোখে এক ফোঁটা ঘুম আসেনি, বা আমি এক ফোঁটাও ঘুমাইনি তখন কেমন লাগে? ঘুম কি তেল বা পানি, নিদেনপক্ষে ওষুধ? এটা ফোঁটা দিয়ে হিসাব করতে হবে? ঘুম পরিমাপযোগ্য কোনো বস্তু এই তত্ত্বের আবিষ্কারক কে! মানুষের ঘুমের সঙ্গে ফোঁটা, ছটাক বা সেরের কোনো সম্পর্ক নেই, থাকতে পারে না!