দুর্নীতির প্রভাব যে বাংলাদেশে প্রকট তা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাইতো চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সরকারের যা অর্জন তা কতিপয় দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা আর কিছু অসত্ রাজনীতিবিদদের কুকর্মের কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বদা বলেন—তিনি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেন আর এসব অসত্ ব্যক্তিদের কারণে মানুষের জন্য তার গৃহীত পদক্ষেপের সুযোগ-সুবিধা হতে জনসাধারণ বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকারি সেবা পেতে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রায় বেশির ভাগ সরকারি সেবা পেতে গিয়ে জনসাধারণকে কমবেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। আর এসব অসাধু কর্মকর্তা জনগণের টাকা মেরে নিজেরা টাকার পাহাড় গড়ছে। যুগের পর যুগ এরা সরকারের টাকা, জনগণের টাকা মেরে এসব সম্পদের পাহাড় গড়েছে। বাংলাদেশের সরকারি সেবাদানকারী প্রায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কতিপয় কর্মকর্তা এসবের সঙ্গে জড়িত। জনসাধারণ সেবা নিতে গেলে বিভিন্ন অজুহাতে তারা ফাইল আটকে রাখে। তাছাড়া তাদের দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করে না। সরকারি অর্থ বেশি ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাত্ করে।
পূর্বে ভাবা হতো তাদের প্রাপ্য বেতনের চেয়ে জীবন ধারণের ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তারা এগুলো করতে বাধ্য হয়; কিন্তু এসব কথা এখন আর সত্য নয়। কারণ পূর্বের তুলনায় তাদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে, তার পরেও কেন তারা দুর্নীতি করবে? আসলে এর পিছনে কারণ হচ্ছে ভোগবাদী মানসিকতা। আমরা এমন একটা সমাজে বসবাস করছি সেখানে খুব কম লোকই অন্যের কথা ভাবে। সুতরাং এসব অসাধু কর্মকর্তা যদি একবার ভাবত জনগণের টাকায় আমি বেতন পাচ্ছি, তাদের সেবা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব, আমি যে পবিত্র দায়িত্ব হাতে পেয়েছি তা যথার্থভাবে পালন করা উচিত।
যে দেশের মানুষ ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, একজন বঙ্গবন্ধুর ডাকে একত্রিত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। সে জাতির পক্ষে এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি দূর করা অবশ্যই সম্ভব। এই জন্য সবার আগে দুর্নীতিবিরোধী এই জিহাদে দেশের জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করা। এটা করতে হলে অবশ্যই যে কাজটি সবার আগে করতে হবে সেটি হচ্ছে জনগণকে তার অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে, তারা যদি জানতে পারে তার অধিকার থেকে সে বঞ্চিত হচ্ছে তাহলে সে অবশ্যই প্রতিবাদ করার চেষ্টা করবে। এই জন্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব সরকারি কর্মকর্তা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে অন্য কর্মকর্তরা সতর্ক হতে পারে। অনেক কর্মকর্তা দুর্নীতি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও দ্রুততম সময়ে তাদের বিচার হচ্ছে না। যা দেখে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তার মনে ঐ বাসনা সৃষ্টি হয়। তৃতীয়ত, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। সব অফিস-আদালতে স্বচ্ছতা আনয়নের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। চতুর্থত, দুদকের কাজের গতিশীলতা আনয়নের জন্য যোগ্য, সত্ পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। তারা যাতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্বপালন করতে পারে। পঞ্চমত, প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে দুর্নীতির অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। জনসাধারণের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাতে হবে যেন তারা যেখানেই দুর্নীতি দেখবে সেখানেই অভিযোগ জানাতে পারে।
ষষ্ঠত, যেসব অসত্ রাজনীতিবিদ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তারা যেন কোনো অবস্থায় রাজনীতিতে উচ্চ জায়গায় না যেতে পারে সে বিষয়ে সব দলকে খেয়াল রাখতে হবে। অসত্ রাজনীতিবিদদের দলীয়ভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেন অন্যরা বুঝতে সক্ষম হয়—অসত্ হলে দলের মনোনয়ন পাওয়া যাবে না।
সর্বোপরি দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। আমাদের প্রশাসনে অনেক সত্ কর্মকর্তা আছেন যারা সত্যিকার অর্থেই দেশকে ভালোবাসেন তাদেরকে অবশ্যই দ্রুত পদন্নোতি দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ পেতে হলে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা, তারা যখন চাকরিতে যোগদান করবে তখন কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে—এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
দেশকে এগিয়ে নিতে দেশপ্রেমের চেতনাকে উজ্জীবিত করতে হবে। মা মাটি মানুষের কল্যাণে একটি শোষণমুক্ত সমাজ তখনই প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
