কালজয়ী সাগরদিঘী

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:২৯

বুকে গভীর জল নিয়ে পাল রাজবংশের শাসনামলে খনন করা সাগরদিঘী কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায়। দিঘীটির অবস্থান ঘাটাইল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কি. মি. পূর্বদিকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এলাকাটির পূর্ব নাম ছিল লোহানি। কীর্তিমান পুরুষ সাগর রাজা দিঘী খনন করার পর তার নামের সঙ্গে দিঘী যোগ করে এলাকার নামকরণ করেন সাগরদিঘী। সেই থেকে পাহাড়ি জনপদটি সাগরদিঘী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। দিঘীর পাড়সহ মোট আয়তন ৩৬ একর। দিঘীর পাড় বেশ চওড়া হওয়ায় একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বেশকিছু স্থাপনা। উত্তর পাড়ে রয়েছে সাগরদিঘী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ পাড়ে সাগরদিঘী দাখিল মাদ্রাসা। পশ্চিম পাড়ে রয়েছে অস্থায়ী এলজিইডি বাংলো এবং পূর্বপাড়ে সাগরদিঘী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র।

এক সময় দিঘীর যৌবনের আলোকছটায় মুগ্ধ হতো শতশত প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থী। সবুজের সমারোহে ভরপুর ছিল দিঘীর পাড়। আর সবুজ পত্রপল্লবের নান্দনিক পরিবেশ বিষণ্ন মনেও দোলা দিয়ে যেত চোখের পলকে। স্বচ্ছ পানির ঢেউ আছড়ে পড়তো দিঘীর পাড়ে। গ্রীষ্মের খা খা রোদ্দুরে অচেনা পথিকের গোসল ও পিপাসা দুটোই মেটাতো এর পানি।

জনশ্রুতি আছে, বহুকাল আগে পাল রাজাদের শাসনামলে এ অঞ্চল ছিল ঘন বন আর জঙ্গলে ভরা। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় বন্যপ্রাণি আর জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল অঞ্চলটি। এরই মাঝে গড়ে ওঠে মানুষের বসবাস। তবে এখানে পানির সঙ্কট ছিল তীব্র। সাগর রাজা তার প্রজাদের সুপেয় পানির জন্য একটি দিঘী খননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই অনুসারে, ৩৬ একর জমির ওপর দিঘী খননের কাজ শুরু করেন। দিঘীটি খননে সময় লাগে প্রায় ২ বছর। আর এতে খনন কাজে অংশ নেয় ২ হাজার শ্রমিক।

 

দিঘী খননে রানির আত্মবিসর্জন

দিঘীর খনন নিয়ে লোকমুখে নানা কাহিনি শোনা যায়, দিঘী খননের পর পর্যাপ্ত গভীরতা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে দিঘীর তলানীতে পানি না ওঠায় রাজা চিন্তিত হয়ে পড়েন। কোনো এক রাতে রাজা স্বপ্নে আদিষ্ট হন, যদি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে দিঘীতে নামানো হয় তাহলে দিঘীতে পানি উঠবে! রাজা ঘুম থেকে জেগে সকালে রানিকে সব খুলে বললেন। সব শুনে রানিও প্রজাদের সুখের কথা চিন্তা করে দিঘীতে নামার প্রয়াস ব্যক্ত করেন। দিনক্ষণ ঠিক করা হলো। রাজার বিষ্ময়কর এমন সিদ্ধান্তের বাস্তব দৃশ্য নিজ চোখে দেখার জন্য নির্দিষ্ট দিনে কৌতুহলী জনতা দিঘীর চারপাশে ভিড় জমায়। শুকনো দিঘীতে রানি নামলেন। কিছুদূর যেতেই দিঘীর তলদেশ থেকে পানি উঠতে শুরু করে। দেখতে দেখতে রানির সমস্ত শরীর ডুবে যেতে লাগলো। রানিকে উদ্ধারে চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না রাজার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাঁচানো গেল না রানিকে। প্রজাদের সুখের জন্য রানির আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেল সাগর রাজার দিঘী। পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হলো দিঘী। সাগর রাজার নামেই দিঘীটির নামকরণ হলো সাগরদিঘী। এ অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকদের বিশ্বাস এখনো রানির আত্মা রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ায় দিঘীর পাড়ে। তাই তারা রানির আত্মাকে শান্ত রাখতে বিভিন্ন সময় পূজা অর্চনা করে থাকে। 

  

রূপের নাইকো শেষ

বর্ষায় চারদিকে জল থইথই করে। দিঘীর স্বচ্ছ সফেদ জলরাশিতে দৃষ্টি জুড়ায়। অসীম আকাশটির ছবিও স্বচ্ছ দিঘীর জলে দেখা য়ায়। শস্য সবুজে গ্রামীণ মানুষের যাপিত জীবন দেখতে হলে গ্রাম্য দর্শন যেমন প্রয়োজন, তেমনই দৃষ্টিনন্দন সাগরদিঘী একবার হলেও দেখা চাই। প্রকৃতিও এখানে দারুণভাবে বাংলার রূপ তুলে ধরেছে। কলমীর গন্ধ ভরা দিঘীর জলে ভাসে হাঁস। দিঘীর পাড়ে অসংখ্যক বৃক্ষরাজি। ওড়াউড়ি কাক, শালিক, ধবল বক কিংবা শঙ্খচিলের। সৌন্দর্যে ভরা দিঘীটির সান্নিধ্যে গেলে জলের ছলাত্ ছলাত্ শব্দে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নেওয়া আর বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়া যায়। সাগর রাজা এ অঞ্চলে রেখে যাননি কোনো রাজ প্রাসাদ। তবে তার স্মৃতিবিজড়িত দিঘীটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে।