ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন ভ্রমণ খুব আন্দদায়ক—তা যদি হয় নির্ঝঞ্ঝাট। বৃহস্পতিবার সপরিবারে সকাল ৭টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ‘সোনার বাংলা’ ট্রেনের যাত্রাটা আমার দীর্ঘদিনের ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সিটে একটু থিতু হয়ে বসেছি। হঠাত্ দেখি চারদিক থেকে দুই-চার জন করে আমার কাছে এসে পরিচয় দিয়ে বলে তারা সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। চট্টগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রথম মিলনমেলা বসবে, তারা তাতে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে আমাকে আগেই আয়োজকরা অবহিত করে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। তারা সাবেক উপাচার্যদেরও সম্মান জানাবেন। ট্রেন বিমানবন্দর স্টেশনে থামলে দেখি হুড়মুড় করে শত শত যাত্রী উঠছেন। জানা গেল তাদের বেশির ভাগই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। অনেকের সঙ্গে ছোটো ছোটো বাচ্চারা। বিমানবন্দর স্টেশন ছাড়ার পর কী করে জানি সারা ট্রেনে খবর ছড়িয়ে পড়ল আমিও চট্টগ্রামে যাচ্ছি। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই দলে দলে আমার পুরোনো শিক্ষার্থীরা এসে আমার বগিতে এক হুলস্থূল কাণ্ড বাধিয়ে দিল। যতই নিষেধ করি, কয়েকজন পা ছুঁয়ে সালাম করবেই। আমি কিছুটা আবেগাপ্লুত। কে বলে আজকাল শিক্ষার্থীরা আর শিক্ষকদের সম্মান করে না? আসলে সম্মানটা জোর করে আদায় করার জিনিস নয়, তা অর্জন করতে হয়। ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে। দুই পাশে মাঠভরা পাকা ধান। কুমিল্লার পর শুরু হলো ধানক্ষেতের মাইলখানেক দূরে নীল পাহাড় আর ঘন অরণ্য। মাঝে মধ্যে কোথাও কোথাও কৃষক ধান কাটছেন। এই পথের সেই পঞ্চাশের দশক থেকে আসা-যাওয়া করছি। কিন্তু কখনো চারদিকের দৃশ্যকে এত মনোরম মনে হয়নি। দুপুর ১২টার কিছু পর ট্রেন চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে থামল। সেখানে ঢাকা থেকে আগত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্বাগতম জানাতে এসেছে আমার আরেক প্রাক্তন ছাত্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম।
পরদিন সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আমার বাসা থেকে অনুষ্ঠানস্থল ১ কিলোমিটারের মতো দূরের একটি কনভেনশন সেন্টারে। যেহেতু চট্টগ্রামে আমার কোনো নিজস্ব বাহন নেই, তাই রিকশাই একমাত্র ভরসা। ভাড়া ৪০ টাকা। রিকশাচালক অনেক অলিগলি চেনেন। মিনিট ১৫-র মধ্যে যখন অনুষ্ঠান স্থলে রিকশা থেকে নামছি, তখন আমার অনেক প্রাক্তন ছাত্র অবাক হয় আমাকে রিকশা থেকে নামতে দেখে। প্রশ্ন করে আমার গাড়ি কোথায়? যখন বলি চট্টগ্রামে আমার কোনো গাড়ি নেই আর আমি প্রয়োজনে টেম্পোতেও চড়তে পারি, তখন সবাই আরেক দফা অবাক হয়। এটা আমার একধরনের মধ্যবিত্ত আচরণ। ১৯৯৬ সালে আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন উপাচার্যের জন্য তিনটা গাড়ি বরাদ্দ ছিল। একটি নিজের, একটি বেগম সাহেবের, অন্যটি বাড়ির কাজে নিয়োজিত। আমার কাছে এই সব অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য মনে হয়েছিল। একটি রেখে বাকি সব পুলে পাঠিয়ে দিই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব পালনকালে একই ব্যবস্থা। দাপ্তরিক কাজ ছাড়া সাধারণত নিজের কাজে আমার নিজের খরচে নিজের গাড়ি ব্যবহার করেছি। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের পরপরই আমার এক ঝাঁক মধ্যবয়সী সাবেক শিক্ষার্থীরা ঘিরে ধরে। অনেকে শুধু নিজের পরিবারের সদস্যদেরই পরিচয় করিয়ে দেয় তা নয়, কয়েকজন তাদের নাতি-নাতনিকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। দু-এক জন বলা শুরু করে, প্রথম দিন আমি ক্লাসে কী আলোচনা করেছিলাম। এক জনের আবার গোটা দুয়েক পরীক্ষার প্রশ্নও মনে আছে। আমার প্রথম দিককার ছাত্রী নুরুন নাহার। একটি বেসরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষয়ত্রী। সঙ্গে করে দশ বছরের নাতি মিশুকে নিয়ে এসেছে। মিশুকে বলে, ‘আমার শিক্ষক। সালাম করো’। মিশু অবাক হয়ে দাদির মুখের দিকে তাকায়। তার বিশ্বাস হয় না, শিক্ষক দাদিরও একজন শিক্ষক থাকতে পারে। মিশুকে কোলে তুলে নিই। শুধু দাদি নয়। হাটহাজারী থেকে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অর্থনীতিতে ভর্তি হয়েছিল। তার ২৫-৩০ জন সহপাঠীর মধ্যে এখন কেউ বেঁচে নেই বলে তিনি জানান। চারটি বিভাগ ও ২০৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার যৌবনকাল পার করেছেন। সম্ভবত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বড়ো বড়ো শহরে এই ধরনের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তুলেছে। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, ডালাস, টরেন্টো, ক্যানবেরা সব জায়গায় এরকম বড়ো বড়ো শহরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক্তন ছাত্র সংগঠন আছে। প্রতি বছর না হলেও নিয়মিত বিরতি দিয়ে তারা এমন মিলনমেলা করে। তার সঙ্গে আরো আছে চট্টগ্রাম সমিতি। তারা আরো অনেক বেশি সক্রিয়। আর কিছু না হোক প্রতি বছর মেজবান করা চাই।
কিছু পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য ড. শিরিন আখতার এলে জাতীয় পতাকা আর পায়রা উড়িয়ে সম্মিলিতভাবে মিলনমেলার উদ্বোধন করা হয়। আমি যখন উপাচার্য তখন আমার বন্ধুপত্নী ড. শিরিন আখতার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন। এখন তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বেশ ভালো লাগল। সার্বিকভাবে একটি নতুন প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। তাদের থাকার কথা অনেক নতুন চিন্তাধারা। নতুন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম তৈরি করার দায়িত্ব তাদের হাতে। অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব।
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের জন্য সময়টা খুব ভালো যাচ্ছে না। পূর্বের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা প্রায় সময় নানা যুক্তির কিংবা অযৌক্তিক কারণে একটি মহলের রোষানলে পড়েন এবং অনেক সময় তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার জন্য একটি মহল উঠে পড়ে লাগে এবং তারা তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে। আমি উপাচার্য থাকাকালে আমাকে তো দুইবার হত্যা করার চেষ্টাই করা হয়েছিল। অন্যদিকে ২০০১ সালে বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসে দেশের ১১ জন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে অত্যন্ত অনৈতিকভাবে কোনো কারণ ছাড়া কলমের এক খোঁচায় অপসারণ করেছিলেন। তখন এই মহলটি তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। দুঃখজনক ভাবে জাতিগত ভাবে আমরা এখনো বিভক্ত রয়ে গেছি। এই বিভক্তির প্রতিফলন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, দেশের রাস্তাঘাট সেতু-কালভার্ট থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিতেও দেখা যায়। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল পার করার পরও আমাদের জাতিগত ভাবে এক হতে না পারাটার মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতি পদে পদে।
বর্তমান সময়টা খুবই অস্থির। চতুর্দিকে সামাজিক অবক্ষয়ের ছড়াছড়ি। সেই অবক্ষয় যেমন তরুণ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়েছে, ঠিক একইভাবে অনেক শিক্ষকদের মাঝেও ছড়িয়েছে। কথায় বলে, পরিবারে বাবা-মা যদি আদর্শবান হন, তাহলে তাদের সন্তানরাও আদর্শবান না হওয়ার কোনো কারণ নেই। অভিভাবক যদি অসত্ হন, তাহলে সন্তানদেরও অসত্ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ঠিক একই কথা শিক্ষকদের বেলায়ও সত্য। এখন মুক্তচিন্তা আর প্রগতির যুগ। তবে এর সংজ্ঞা কী তা জানা যায় না। প্রকাশ্যে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দেখা হয়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমানে ভারতের একটি নামী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম অশান্তি চলছে। কর্তৃপক্ষ ছাত্র বেতন ১০ রুপি থেকে বৃদ্ধি করার প্রতিবাদে তারা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে। যারা রাস্তায় নেমে এই ‘অন্যায়’-এর প্রতিবাদ করছে, তাদের সবার হাতে দামি স্মার্ট ফোন। ভারতীয় এক টিভি চ্যানেলে দেখলাম সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক শিক্ষকের গবেষণাগারে ‘প্রতিবাদী’ শিক্ষার্থীরা তালা মেরে দিয়েছে। বাংলাদেশে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সদর দরজাতেই তালা ঝুলিয়ে দেয়। কখনো কখনো উপাচার্যের বাসভবন বা দপ্তরের সামনে ‘প্রগতিশীল’ শিক্ষকরা চেয়ার পেতে বসে ‘দুর্নীতি প্রবণ’ উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন। সঙ্গে থাকেন তাদের বশংবদ কিছু শিক্ষার্থী। এই সংস্কৃতিটা চালু হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এরশাদ পতনের পর যখন তত্কালীন উপাচার্য এক সভায় বলেছিলেন ‘স্বৈরাচারের পতন হয়েছে ঠিক তবে স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে’। এই কথা ক্যাম্পাস দখলকারী স্বাধীনতাবিরোধীরা কেন মানবে? তারা উপাচার্যকে ১২ দিন গ্যাস, বিদ্যুত্ বন্ধ করে তাকে সরকারি বাড়িতে বন্দি করে রেখেছিল। দুঃখজনক হলেও তাদের এই কাজে সার্বিক সহায়তা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক। এমন শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের কী শিক্ষা দিতে পারেন? অভিভাবক ও শিক্ষক ভালো হলে শিক্ষার্থীদের অর্বাচীনের মতো আচরণ করার সম্ভাবনা কম।
পুরো মিলনমেলায় থাকতে পারিনি। আমিসহ চার জন সাবেক উপাচার্য সেই সকালের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার স্নেহের শিক্ষার্থীরা আমাদের মঞ্চে ডেকে সম্মান জানাতে ভুলেনি। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে গলা ধরে আসে। তার পরও একটু করে বলি ১৯৭৩ সালে আমার ৪৫০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার কথা। বলি, সেই সময় এক জন ক্ষণজন্মা পুরুষ বাংলা ও বাঙালির সরকার প্রধান ছিলেন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জানতেন ৪৫০ টাকায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পরিবার নিয়ে চলা কঠিন। বেতনের সম্পূরক হিসেবে তিনি মাসে দুইবার রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতিবার দুই কেজি গম আর আধা কেজি চিনি। অনেক অভাবের মধ্যেও সেই সময়টা আমার কাছে সোনালি দিন। সমাজে শান্তি ছিল। মূল্যবোধের মূল্য ছিল। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান বুঝতেন। কর্মজীবনে অনেক দায়িত্ব পালন করেছি তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো আমার কাছে ছিল এক সোনালি অধ্যায়। এই প্রথম মিলনমেলা আয়োজনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন অনেকেই। সবার প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা।
n লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

