ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্ত

মূল অভিযোগই হারিয়ে যাচ্ছে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩০

আগামী মাসের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্ত শেষ করতে চান ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যে অভিশংসন করা সম্ভব না সেটা তারাও জানেন। কারণ প্রতিনিধি পরিষদ পারলেও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সেটা সম্ভব হবে না। দুই জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও সিনেটে গিয়ে তারা মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পকে প্রতিনিধি পরিষদেও অভিশংসন করা সম্ভব হবে কি না সেটাই প্রশ্ন। অথচ দুই দলই এই তদন্তকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপন বাবদ কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে।

আসল অভিযোগই নেই: দুই সপ্তাহ ধরে চলা ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত কমিটির শুনানি করেছে। ১২ জন্য কমিটিতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ তাদের। সবচেয়ে বেশি যারা অভিযোগ করেছেন তারা পেশাদার কূটনীতিক যারা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেছেন। তারা গত কয়েক বছরের ই-মেইল, টেক্সট মেসেজ এবং সমসাময়িক কিছু নোটের উদ্ধৃতি দিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। টেলিভিশনে সম্প্রচার করা তাদের সাক্ষ্যে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অফিস ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন। এই অভিযোগেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে অভিশংসন করতে চান।

১২ জনের সাক্ষ্যে সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা, যা ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টিকে জীবন দিচ্ছে। কারণ কোনো সাক্ষীই এটা বলেননি যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে সরাসরি ইউক্রেনকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য চাপ দিতে এবং না হলে সামরিক সহায়তা বন্ধে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিছু রিপাবলিকান বলছেন, এটাই সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা তদন্তে। যদিও ধারণা করা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প কিছু একটা করেছিলেন। কিন্তু এটা প্রমাণ করে না যে, ট্রাম্প দোষী। তাই তাকে অভিশংসন করাও ডেমোক্র্যাটদের জন্য সহজ হবে না। আর রিপাবলিকানদের মধ্যে তার সমর্থন বাড়ছে। তাদের মতে, ট্রাম্পের কাজ হয়তো ভুল ছিল, তবে তা অভিশংসনের যোগ্য নয়।

এর বড়ো প্রমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে মার্কিন রাষ্ট্রদূত গর্ডন সোন্ডল্যান্ডের সাক্ষ্য। তদন্ত কমিটির সদস্যদের জেরার মুখে বিস্ফোরক দাবি করেন তিনি। উল্লেখ্য, বিত্তবান হোটেল মালিক হিসেবে তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক কার্যকলাপে মুক্ত হাতে দান করে এসেছেন। সোন্ডল্যান্ডের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জো বাইডেন ও তার পুত্রের কার্যকলাপ সম্পর্কে দু-দুটি তদন্তের জন্য ইউক্রেনের ওপর ট্রাম্প যে প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যত সব কর্তাব্যক্তিই অবগত ছিলেন। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও নাকি জানতেন যে ট্রাম্প কংগ্রেস অনুমোদিত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাহায্য বন্ধ রেখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। দাবি মানলে ট্রাম্প সামরিক সাহায্যের ছাড়পত্র ছাড়াও হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণের টোপও দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আনা হচ্ছে।

সোন্ডল্যান্ড আরো বলেন, এ ক্ষেত্রে তিনি প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পালন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে তাকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানির সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়েছিল। তার মতে, গোটা বিষয়টি মোটেই আর গোপন ছিল না। তিনি এই মর্মে একটি ই-মেইল পাঠিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সহযোগিতার বিষয়ে জানিয়েছিলেন। পম্পেও ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক কর্তাব্যক্তি সেই ই-মেইল পেয়েছিলেন। সোন্ডল্যান্ড অবশ্য স্বীকার করেন, যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনো তাকে সরাসরি বলেননি, যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত চালালে তবেই ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ সামরিক সাহায্যের ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

ডেমোক্র্যাটদের এখন প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্তে খসড়া প্রস্তুত করবেন কি না। নাকি প্রত্যক্ষ সাক্ষীর জন্য আরো শুনানি করবেন। তাদের এমন সাক্ষী পেতে হবে যিনি প্রমাণসহকারে বলবেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন ইউক্রেনকে চাপ দিতে। এমন কর্মকর্তা অবশ্য আছে যারা ডেমোক্র্যাটদের শূন্য স্থান পূরণ করতে পারবেন। ডেমোক্র্যাটরা হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ (ভারপ্রাপ্ত) মিক মুলভ্যানি এবং সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করেছিলেন। কিন্তু তারা হাজির হননি, বরং আদালতে আবেদন করেছেন যেন তাদের হাজির হওয়া না লাগে। এই দুই ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু এদের কাছ থেকে ডেমোক্র্যাটরা কোনো তথ্য পাবেন এমন আশা দেখা যাচ্ছে না। রিপাবলিকান দলের নেতারা এখনো ট্রাম্পের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন। তাদের মতে, শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গোটা তদন্ত চালানো হচ্ছে।

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিও (ডেমোক্র্যাট) বলেছেন, তিনি এই তদন্ত কার্যক্রম আর এগিয়ে নিতে চান না। আবার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। কিছু ডেমোক্র্যাট অবশ্য বলছেন, জনগণ বুঝতে পেরেছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না। এটাই তাদের কাছে বড়ো পাওয়া। আগামী নির্বাচনে এর বড়ো প্রভাব দেখা যাবে বলে তারা আশা করেন। গত ২৫ জুলাই ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফোনালাপকে কেন্দ্র করেই বিপত্তির সৃষ্টি হয়।