শ্রীলঙ্কার ক্ষমতায় ফের রাজাপক্ষে ভাইয়েরা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৪৫

শ্রীলঙ্কায় গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন গোতাবায়া রাজাপক্ষে। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ছোটো ভাই। নির্বাচনে তিনি ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৪২ শতাংশ ভোট।

শ্রীলঙ্কার ‘স্ট্রংম্যান’ হিসেবে পরিচিত গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। ভাই মাহিন্দা রাজপক্ষে যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন বলা যায় দেশটির সেনাবাহিনী তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। সে সময় দীর্ঘদিন ধরে চলা লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম বা এলটিটিইর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের অবসান হয় তার হাত ধরেই। এবারের নির্বাচনে জয়ের জন্য তার সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকেই কৃতিত্ব দিচ্ছেন অনেকে। কারণ গত এপ্রিলে শ্রীলঙ্কার গির্জা ও হোটেলে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য ঐ হামলা হয়েছে দাবি করে আসছেন গোতাবায়া। নির্বাচনের আগে তিনি দেশকে জঙ্গি হুমকি থেকে নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি দেন। কোনো সন্দেহ নেই যে এই প্রতিশ্রুতির জন্য তিনি জিতেছেন।

নতুন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া দায়িত্ব গ্রহণের পর গত বুধবার পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। তিনি পদত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানী কলম্বোয় প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ে তিনি শপথ নেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এসেছে রাজাপক্ষে পরিবার।

এবারের নির্বাচনে গোতাবায়ার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবাসন মন্ত্রী সাজিথ প্রেমাদাসা সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহলিদের কাছ থেকে কম ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে গোতাবায়া রাজাপক্ষে সিংহলি অধ্যুষিত এলাকায় বেশি ভোট পেয়েছেন। শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের নাগরিকদের অধিকাংশই গোতাবায়া কম ভোট পেয়েছেন। এসব অঞ্চলের বাসিন্দা মূলত তামিল, হিন্দু ও মুসলিমরা। 

এবারের নির্বাচনে গোতাবায়ার প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল দেশকে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি থেকে মুক্ত করা এবং অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক সংস্কার করা। জয়ের পর তিনি কাজ দেখানোর সুযোগ পেয়েছেন। শিগিগরই যোগ্য লোকদের নিয়োগ করে অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া জঙ্গি হুমকি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেবেন।

শ্রীলঙ্কার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এই দুই ভাই ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন। ১০ বছর পর তারা আবারও ক্ষমতায় ফিরেছেন। কিন্তু এই রাজাপক্ষে পরিবারের অতীতের ভূমিকায় অনেকটাই বিচলিত দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম ও তামিলরা! কারণ শেষবার তারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ আছে, আত্মসমর্পণ করা এলটিটিই সেনাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের নীতির কারণেই। এমনকি সাদা পতাকা দেখানোর পর বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পরও তাদের হত্যা করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোও রাজাপক্ষে ভাইদের ক্ষমতায় আসার বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী বছরগুলোতে গুমের ঘটনা অব্যাহত ছিল। রাজাপক্ষেদের বিরোধী হিসেবে মনে করা হয়, এমন ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের আটক করার পর তাদেরকে আর কখনো দেখা যায়নি। তবে রাজাপক্ষে পরিবার ঐসব ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তাদের সরকারের কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করে আসছে।

গোতাবায়ার জয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিরা উল্লসিত। তাদের কাছে এই দুই ভাই হলেন যুদ্ধের হিরো। কিন্তু তাদের ক্ষমতায় ফেরায় তামিল ও মুসলিমরা হতাশ। গত এপ্রিলে সন্ত্রাসী হামলার পর দেশটিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বেড়েছে। বিভিন্ন সময় মুসলিমদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে সিংহলি জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজাপক্ষে ভাইদের ফেরায় মুসলিম ও গণতন্ত্রপন্থিদের ওপর হামলার আশঙ্কাও বেড়েছে। মুসলিমদের আশঙ্কা জাতীয় নিরাপত্তার নামে তারা সরকারের টার্গেটে পড়তে পারে। বিশেষ করে গোতাবায়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা বদু বালা সেনা নামে সিংহলি-বৌদ্ধ গুন্ডারা মুসলিমদের ওপর চড়াও হতে পারে। যেটা দেখা গিয়েছিল ২০১২ সালের পর। যদিও গোতাবায়া শ্রীলঙ্কার সব নাগরিকের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতি তিনি কতটা রক্ষা করেন সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় দেশটির সংখ্যালঘু মানুষ।