দেশব্যাপী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আদায়ে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও কার্যকর সুফল মিলছে না। যে সব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসের কাছ থেকে নিবন্ধন নিয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই ভ্যাট দেয় না। এনবিআরের ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনার অফিস সম্প্রতি এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে ওই অফিসের আওতাধীন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭২ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই কমিশনারেটের আওতাধীন রাজধানীর ৬৯টি বড় মার্কেট ও শপিংমল জরিপ করে মোট ৮ হাজার ৭৫২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধিত হিসেবে পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৪৩৫টি প্রতিষ্ঠান। আর অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪ হাজার ২৭৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৭৫টি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদানকারী এবং ৬৫১টি প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট প্রদানকারী হিসেবে পাওয়া গেছে। প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট প্রদান-কারীদেরও হিসাবভুক্ত করলে মোট ভ্যাট প্রদানকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ২২৬টি। অর্থাত্ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভ্যাট প্রদান করে ২৮ শতাংশের কিছু কম। ভ্যাট প্রদান করে না - এমন প্রতিষ্ঠান ৭২ শতাংশের উপরে। আর জরিপে পাওয়া মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় নিলে ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৪ শতাংশ।
কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা দক্ষিণের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, জরিপে প্রাপ্ত এই তথ্য আমরা ইতোমধ্যে এনবিআরে পাঠিয়েছি। এর আগেও একবার এ ধরনের জরিপকাজ চালানো হয়েছিল। যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাটযোগ্য, তাদের ভ্যাটের আওতায় আনতে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। ইতোমধ্যে কিছু কার্যক্রম শুরু করেছি।
২০১০ সালে সব সিটি করপোরেশন, জেলা শহরে অবস্থিত বড় ও মাঝারি পণ্য বিক্রয়কারী সেবা প্রদানকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর ও পিওএস (পয়েন্ট অব সেল) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৮ হাজার ৫৫৯টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা বিক্রয় সংক্রান্ত লেনদেন ইসিআর বা পিওএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে হিসাব রাখা বাধ্যতামূলক করে। ওই তালিকায় রয়েছে- হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ফাস্ট ফুড, মিষ্টির দোকান, ফার্নিচার, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল ও জেনারেল স্টোর, জুয়েলারি, মাঝারি ও বড় আকারের পাইকারি ও খুচরা দোকান এবং মেট্রোপলিটন এলাকার শপিংমলে অবস্থিত সব ধরনের দোকান।
অবশ্য গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইসিআর স্থাপনের ক্ষেত্রে খুব একটা সফলতা আসেনি। অথচ এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ইসিআর কিংবা পিওএস মেশিন ব্যবহারে সক্ষম সারাদেশে অন্তত ২ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত বাজেটে বিশেষায়িত হিসাব যন্ত্র (ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা ইএফডি) চালুর কথা জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত নভেম্বর থেকে দেশের সব সিটি কর্পোরেশন এলাকা এবং পহেলা ডিসেম্বর থেকে সব জেলা শহরে এই ইএফডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এখনো তা চালু করা যায়নি।
সম্প্রতি ভ্যাট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ যন্ত্রটি দ্রুত চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তবে কবে নাগাদ এটি চালু করা যাবে, তা পরিষ্কার করেননি। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা জনগণের কাছ থেকে যে ভ্যাটের অর্থ আদায় করে, তা যথাযথভাবে রাজস্ব কোষাগারে জমা দিলেও রাজস্ব আদায় অনেক বাড়ত।
এদিকে সরকারের ভ্যাট আদায়েও ধীর গতি চলছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ভ্যাট আদায় বেড়েছে মাত্র দুই শতাংশ। অথচ সরকার চলতি অর্থবছর প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা।
