আনারসের রাজ্যে একদিন

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:০২

l সুমন্ত গুপ্ত

 

অনেকদিন ধরে আমার সহকর্মীরা বলছিলেন, ‘আপনি তো অনেক ঘুরে বেড়ান। একবার আমাদের নিয়ে চলেন কোথাও, ঘুরে আসি।’ ভাবলাম, কোথায় নিয়ে যাওয়া যায় সবাইকে। কিন্তু কিছুই ঠিক করতে পারলাম না। পড়লাম ভীষণ মুশকিলে। এদিকে সবাই যেতে চায় যেখান থেকে দিনে দিনে ফিরেও আসা যায়। এর মধ্যে বন্ধু তন্ময়ের ফোন, ‘কেমন আছিস? অনেকদিন তোকে দেখি না। একদিন আয় আমাদের শ্রীমঙ্গলে।’ বললাম, ‘ওখানে নতুন কিছু কি আছে দেখার মতো?’ ও বলল, ‘নতুন কিছুই নেই। তবে তুই এখানকার আনারস বাগান দেখতে পারিস। শ্রীমঙ্গলের মোহাজেরাবাদ, বিষামনি, পিচের মুখ বা সাতগাঁও পাহাড়ে আনারসের আবাদ হয়।’ মনে মনে খুশি হলাম, যাক বাবা, একটা জায়গা পাওয়া গেল। এখন সবাই যেতে রাজি হলেই হলো। ওকে জানালাম, আসছে শুক্রবার কয়েক জন অতিথি নিয়ে ওদের এখানে হানা দিতে পারি। ও খুব খুশি মনে বলল, ‘চলে আয়।’ এ আমন্ত্রণের কথা জানালে সবাই বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে গেল। নির্ধারিত দিনে সকাল ৭টায় সবাই এসে উপস্থিত হলো। মোট আট জনের দল নিয়ে রওনা দিলাম। গাড়ি চলছে সিলেট শহর থেকে লালাবাজার, তাজপুর হয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে, পথে বৃষ্টি হানা দিল মুষল ধারায়। বৃষ্টি দেখতে দেখতে পৌঁছালাম শ্রীমঙ্গলে। এবার বিরতির পালা। কারণ সবার পেটে রাম-রাবণের যুদ্ধ চলছে। চৌমোহনা এলাকার বিখ্যাত ম্যানেজার স্টলে নাস্তা সেরে আবার রওনা দিলাম। পথে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো বন্ধু তন্ময়। চা বাগানের মাঝ দিয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। বৃষ্টিও থেমে গেছে। গাছের ফাঁকে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল সারি সারি ভ্যানভর্তি আনারস নিয়ে শহরে যাচ্ছে একদল লোক। ভ্যানের পাশাপাশি সাইকেলেও আনারস ঝুলিয়ে বাজারে যাচ্ছে অনেকেই। দেশের সবচেয়ে বেশি আনারস উত্পন্ন হয় এই শ্রীমঙ্গলে। তাই শ্রীমঙ্গলকে অনেকে আনারসের রাজধানীও বলে থাকেন। এই আনারস সারাদেশে বিখ্যাত অতুলনীয় স্বাদের জন্য। সেই খ্যাতির নমুনা দেখতেই এখানে আসা। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলাম মোহাজেরাবাদের আনারস বাগানের উদ্দেশ্যে। সেখানে আনারস বিক্রির অপেক্ষায় থাকা বনমালি গওলা বললেন, শ্রীমঙ্গলের সুমিষ্ট ‘বিলাতি’ (হানিকুইন) ও রসালো ‘ক্যালেন্ডার’ (জায়ান্ট) আনারসের নাম রয়ে গেছে শুধু, কিন্তু সেই মিষ্টতা, সুগন্ধ ও রসালো আনারসের আজ আর নেই। উত্পাদন কমে যাওয়ায় শ্রীমঙ্গলের বাজার এখন দখল করে নিয়েছে অন্য জেলার আনারস। ষাটের দশকে শুরু হওয়া আনারস চাষের হিড়িকে দুই দশকের মধ্যে স্থানীয় বালিশিরা ও ফয়েজাবাদ হিলসের পুরোটাই আনারস চাষের আওতায় চলে আসে। শ্রীমঙ্গলের আনারসের পরিচিতি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শ্রীমঙ্গলের মৌসুমি ফলের বাজারের চিত্র বদলে গেছে। শ্রাবণ-ভাদ্র পর্যন্ত যেখানে ফলের পাইকারি বাজার পূর্ণ থাকত স্থানীয় আনারসে, সেখানে আষাঢ়ের মাঝামাঝিতেই স্থানীয় আনারসের সমাহার কমে যায়। শুরু হয় অন্য জেলা থেকে আনারসের আমদানি। শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা ও বাহুবলের ফয়েজাবাদ হিলসের ২০/২৫ হাজার একর জমির আনারস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোক্তার রসনা মেটাচ্ছে গত চার-পাঁচ দশক ধরে। কিন্তু এখন ভোক্তার সংখ্যা বাড়লেও আনারসের প্রাপ্যতা তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত হ্র্রাস পেয়েছে। আর এ শূন্যতা পূরণ করছে মধুপুরের আনারস। তবে মধুপুরের আনারসে ভোক্তার রসনা তৃপ্ত হয় না পরিপূর্ণভাবে। মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় ফাঁপানো এ আনারসের সুগন্ধ ও মিষ্টতা শ্রীমঙ্গলের আনারসের ধারে কাছেও না বলে আনারস ভোক্তাদের অভিমত। এখানে বেচাকেনা শুরু হয় খুব সকালে, চলে বিকেল পর্যন্ত। প্রতি একশ আনারস বিক্রির জন্য ভ্যান বা সাইকেলওয়ালা পান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। আবার অনেক চাষি বা মহাজন নিজে সাইকেল বা ভ্যানে করে শহরে নিয়ে আনারস বিক্রি করেন। আমরা হাঁটছি আনারস বাগানে। চোখে পড়ল শত শত শ্রমিক বাগান থেকে টাটকা আনারস নিয়ে ঠেলাগাড়িতে সাজিয়ে রাখছে। সাজনো গোছানো আনারস বাগানের এই সৌন্দর্য কোনো অংশে চা বাগানের চেয়ে কম নয়। এখানে প্রতিটি বড়ো আকারের আনারসের পাইকারি মূল্য ১৬ থেকে ২১ টাকা। আর একটু ছোট আকারের আনারস বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৫ টাকায়। বনমালি গওলা আমাদের জন্য এক প্লেটভর্তি আনারস নিয়ে এলেন। আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না, হাত না ধুয়েই আনারসের টুকরো মুখে দিলাম। আনারস অনেক খেয়েছি, তবে এর স্বাদ অনন্য তৃপ্তি দিয়েছে। সেইসঙ্গে বনমালি গওলার আতিথেয়তা প্রমাণ করে, এদেশের মানুষ সত্যিই অতিথিপরায়ণ। দেখতে দেখতে আমাদের বিদায় নেওয়ার পালা চলে এলো। আনারসের রস চেখে তৃপ্ত ও দেখে মুগ্ধ হতে চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন শ্রীমঙ্গলের আনারস রাজ্যে।

 

কি ভা বে  যা বে ন

 

ঢাকা থেকে বাস অথবা আন্তঃনগর ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যেতে পারেন। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অনেক বাস পাবেন, যেমন :হানিফ, শ্যামলী, ইউনিক ইত্যাদি। ভাড়া ৪৫০-৫০০ টাকা। অথবা চাইলে সিলেট থেকেও যেতে পারেন শ্রীমঙ্গলে।