মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক
তানিয়া সুলতানা তানিশা। একজন সিঙ্গেল মা হয়েও মেধা তালিকায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কনকুক ইউনিভার্সিটির মাস্টার্স প্রোগ্রামে বায়োমেডিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ থেকে অর্জন করেছেন প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড। গবেষক হিসেবে কাজ করছেন সিউলের স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন ল্যাবে। আঁকাবাঁকা কিংবা মেঠো পথে চলার গল্প বলছেন তানিশা...
আমি পড়াশোনায় পিছিয়ে ছিলাম না, আমি জানতাম ভালো ফলাফল করতে হবেই। তবে এতটা যে হবে, ভাবনাতেই আসেনি। সরাসরি ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্ট সার্টিফিকেট এবং একটি সোনার আংটি আমার হাতে তুলে দেন। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে। এসএসসি পাশের পর ঢাকাতে ভর্তি হই। গ্রাম থেকে আসা একটি মেয়ের জন্য শহুরে মানুষ আর স্টুডেন্টদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সে কী লড়াই। ফার্মাসিতে অনার্স শেষ করেছি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। সেখানেও সেরা পাঁচ জনের মধ্যে ছিলাম। ভালো ফলাফলের জন্য লড়াই করতে হয়েছে সেখানেও।
পারিবারিক চাপে অল্প বয়সেই বিয়ে করতে হয়েছে আমাকে। বিয়ের তৃতীয় বসন্ত না যেতেই সেখানে সংসারে অন্ধকার নেমে আসে। অন্যদিকে বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার একটি ছেলেসন্তান হয়। বিয়ে বিচ্ছেদের পর একজন সিঙ্গেল মা হিসেবে আমার এই যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না আমার জন্য। আমার এই অর্জনের কৃতিত্ব আমার মায়ের। বাংলাদেশে আমার মা আমার সন্তানকে সবচেয়ে নিরাপদে রেখেছেন, আমাকে দিয়েছেন আস্থা আর আত্মবিশ্বাস; যা আমার মনের বল বাড়িয়ে দিয়েছে হাজার গুণ বেশি। আমার কেন বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এই প্রশ্ন আর তির্যক মন্তব্য আমার অন্তরে ব্যথা দিয়েছে, সঙ্গে বাড়িয়েছে মনোবল। স্বামীর সঙ্গে আমার উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ যাত্রা নিয়েই সমস্যার শুরু হয়। আমার সার্টিফিকেটের দিকে তাকালে চোখ ঝাঁপসা হয়ে ওঠে, বারবার সেই মানুষগুলোর মুখ ভেসে ওঠে, যারা আমার উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার সংবাদে ভেংচি কেটেছিলেন। শত ভাগ স্কলারশিপ নিয়ে কোরিয়াতে এসে, দিনরাত ল্যাবে থেকে পরিশ্রমের ফলাফল আমায় আপ্লুত করেছে, আরো উদ্যোমী করেছে সামনের দিনগুলোর জন্য। বর্তমানে কোরিয়াতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছি সিউলের স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন ল্যাবে। পাশাপাশি কোরিয়ায় দরিদ্র শিশুদের ইংরেজি শিখাই এবং কাজ করছি কোরিয়ান প্রতিবন্ধীদের নিয়ে।
ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই বাংলাদেশের সিঙ্গেল মায়েদের নিয়ে। আমি তাদের বোঝাতে চাই, স্বামী ছাড়াও মেয়েদের ভালোভাবে বাঁচার অনেক সুযোগ এবং কারণ আছে। ডিভোর্স বা বিধবা হয়ে গেলেই জীবনের শেষ হয় না। জীবনের শেষ তখনই যখন স্বপ্ন মরে যায়।
