প্রজেক্টদেবী সমঅধিকার

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৬

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারী, শিশু ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে ‘প্রজেক্টদেবী’। এর তরুণ প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আবরারের হাত ধরে এরই মধ্যে তারা নিয়েছেন নানা ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল ইসলাম

সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে ‘প্রজেক্টদেবী’। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারী, শিশু ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। এর তরুণ প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আবরারের হাত ধরে তারা নিয়েছেন ব্যতিক্রমধর্মী বিভিন্ন উদ্যোগ।

ছোটবেলা থেকেই মা আর বোনের সঙ্গে থাকতেন আবরার। তার বয়স যখন ১৩, তখনই অনুধাবন করেন মেয়েদের বিভিন্ন বিষয়ে গোপনীয়তা ও সমাজের কটুদৃষ্টির ব্যাপারটি। একসময় তার সামনে তার কাছের এক বান্ধবীও শিকার হন একই রকম সমস্যার। তখন ওই বান্ধবীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আবরার। সে সময় বান্ধবীর পাশে দাঁড়িয়ে সচেতনতার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই আসে ‘প্রজেক্টদেবী’র ভাবনা। এরপর ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট তার হাত ধরে মাত্র ৫ জন সদস্য নিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারী, শিশু ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রজেক্টদেবী। এর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৩৫ জন।

২০১৯ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসেই মাঠ পর্যায়ে প্রথম কাজ করে প্রজেক্টদেবী। প্রজেক্টের নাম ছিল ‘লা ভি এন রোজ’, যার অর্থ ‘লাইফ ইন রেড’ বা লালের মাঝে জীবন। নিজস্ব অর্থায়নে ৫০০ গোলাপ বিতরণ করেন তারা। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরের আশপাশে গোলাপগুলো সকল শ্রেণি ও বয়সের নারীদের দেওয়া হয়েছিল। সেখানেই বসে থাকেনি প্রজেক্টদেবী। সে তার পরের ইভেন্টের কাজ শুরু করে। যার নাম ছিল ‘রেভ্যুলেশন নারী’। যেখানে ফটোগ্রাফি আর কাব্যের একটা প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছিল। যার মূল বিষয় ছিল মাসিক চক্রের সময় পরিচ্ছন্নতা, নারীত্ব এবং নারীর প্রতি কটুদৃষ্টি।

প্রদর্শনীর সবগুলো ছবি ও কাব্য এই বিষয়ের উপরেই ছিল। প্রদর্শনীর পাশাপাশি দুটো আলোচনা সভা করেছিল প্রজেক্টদেবী। প্রথমটি ছিল ‘নারীবাদ কী?’। যা পরিচালনা করেন নূরীন সুহাইলা, তিনি আরাধ্য ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা। আর দ্বিতীয়টি ছিল ‘আত্মরক্ষার গুরুত্ব’, যা পরিচালিত হয় ফিমেল এমপাওয়ারমেন্ট মুভমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং কুইনস ইয়াং লিডার অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী জায়বা তাহিয়া দ্বারা। যা ধানমন্ডির ইএমকে সেন্টারে আয়োজন করা হয়েছিল।

প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ বিভিন্ন জায়গায় দান করা হয়। যার একটা অংশ দেওয়া হয়েছে ‘আধী’কে। তারা সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের হাতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি প্যাড পৌঁছে দেয়। এই অর্থের আরেকটি অংশ ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ছোট্ট রোকেয়াকে দেওয়া হয়েছিল। রোকেয়ার পরিবারের তার চিকিত্সা করানোর মতো সামর্থ্য ছিল না। অর্থের আরেকটি অংশ দান করা হয় একজন মহিলাকে, যিনি তার বাবার ক্যান্সারের চিকিত্সার জন্য অর্থসাহায্য প্রার্থনা করছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা এবং বাবাকে বাঁচানোর জন্য ভিক্ষা করছেন।

আরেকটি অংশ প্রজেক্ট বন্যাকে বন্যা আক্রান্ত এলাকার নারী ও শিশুদের সাহায্য করার জন্য দান করা হয়। প্রাপ্ত অর্থের সর্বশেষ অংশটুকু সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একাংশকে পাঠ্যবই কেনার জন্য দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রজেক্টদেবীর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আবরার।

আবরার আরো বলেন, ‘আমরা সর্বশেষ প্রচারণা চালাই অক্টোবরে। কেননা অক্টোবরে বৈশ্বিকভাবে স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসাবে উদযাপিত হয়। ২২ অক্টোবর ২০১৯-এ আমরা একটি প্রচারণার আয়োজন করি, যার নাম ‘পিংকটোবার নাইনটিন’। আমরা ধানমন্ডিতে সবার মাঝে লিফলেট বিতরণ করি। লিফলেটে স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা ছিল। ২০২০ সাল থেকে আমরা উভলিঙ্গের মানুষদের সামাজিক মর্যাদা, সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করব।’

আবরার আরো বলেন, ‘আমি এমন একটা বিশ্বের স্বপ্ন দেখি, যেখানে নারী ও পুরুষ শক্তভাবে দাঁড়াবে পারস্পরিক সমতা রক্ষার জন্য। আমি চাই, উভয়লিঙ্গের মানুষগুলো সম্মানের সঙ্গে বাঁচুক এবং কোনো ধরনের আর্থিক অসুবিধায় না পড়ুক। তখন তাদের সামাজিক অর্থনীতিতে অবদান রাখারও সামর্থ্য থাকবে। বাচ্চারা দ্রুত শিক্ষিত হয়ে উঠুক। আর পুরুষদেরও তাদের সঠিক অধিকারগুলো দেওয়া হোক।’

তরুণদের উদ্দেশে আবরার বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তরুণ যোদ্ধারা হবেন প্রথম সকালের সূর্যের মতো। আমার প্রজন্মের মধ্যে বিপ্লব করার সামর্থ্য আছে। এটা যেন তারা কাজে লাগায়।’