রম্য

সবারে বাস রে ভালো

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:৫০

 

শান্ত মনে বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে আছি, কাঙ্ক্ষিত বাসটির জন্য অপেক্ষা। দূর থেকে দেখা গেল বাসটি আসছে। গন্তব্যগামী যাত্রীগুলোর হাত-পা শক্ত হয়ে গেল, ভ্রু কুঁচকে, দাঁত-কপাটি কিটমিট করে, চোয়াল শক্ত করে রণে নামার প্রস্তুতি...। শুরু হয়ে গেল বাসে ওঠার লড়াই। কেউ আছে বাদুড়ঝোলা হয়ে, কেউ রণে ভঙ্গ দিয়ে এক পা তুলে শান্তির শহরে শাস্তি ভোগ করছে।

পড়ি তো মরি পেছনেই উঠল এক নারী। ‘ভাই মহিলাদের ইজ্জত দিতে শিখুন’—পাশের সিটে বসে থাকা আধবোজা লোকটির ভাবের উদয় হলো। বলেই ফেলল, ভাই বাসায় কি মা-বোন নেই? এরা মায়ের জাত। সম্মানটুকু দিন। ব্যাস হয়ে গেল একরাশ প্রেম বিলানো। দম ফাটানো বিরক্তির মাঝেও প্রেম বিলানো হলো।

খিস্তিখেউর শেষে পড়ি তো মরি বাসে এক পায়ে দাঁড়ানোর জায়গাটা হলো। কনডাকটর তো তখন ভগবান নমস্য। সামনে আসতেই সবাই জায়গা ছেড়ে দেয় ভাড়া আদায়ে। পথে কিছুটা বাকযুদ্ধ চলে দু-একটা দুপেয়ে লজিস্কিকের সঙ্গে! কানে বাজে সুমধুর প্রেমময় গান। এই জাদুর শহরে কত কিছুই তো পাওয়া যায়।

বহুকষ্টে পাশে দাঁড়ানো নারীর ভিমরুলের চাকের মতো খোঁপা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা। ব্রেক কষল তো সামনে-পেছনে। ড্রাইভার সাহেবেরও প্রেম বিলানোর বদান্যতা। পাশে থাকা আধপাকা লোকটির হাঁক, মুরব্বিদের সম্মান করতে জান না? বেহায়া পা এই সুযোগে কখন যে মুরব্বির পায়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়েছে, তার খেয়াল নেই। এতকিছুর পরও চোখেমুখে বাসায় ফিরে লেবুর শরবতের ঠান্ডা স্বাদ। আপন মনে বেজে ওঠে, ‘মেরেছ কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দিবো না।’

বাসের সামনে-পেছনে দুলুনির পরে আরে তোর বাসায় কি মা-বোন নেই বলেই নারীটি ফিরে তাকায়, এরপর আর কারো মুখে কথা নেই। আরে তুমি! হয়তো স্বামী, নাহলে পুরানো প্রণয় বা অন্য কোনো পরিচিত। খিস্তি শেষে যখন দুজনে হাত ধরে রাস্তায় নামে, তখন প্রেমের চেয়ে আর বড়ো মধুর কিইবা হতে পারে। তখন শুধু তুমি আর আমি। মোরা ভোরের বেলায় ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়...! বিরক্তি গেল জবুথবু হয়ে গলে।

রসময় ব্যস্ত শহরে হোক না একটু বাড়াবাড়ি খিস্তিখেউর। তবু মানুষ স্বপ্ন খোঁজে, স্বপ্ন গড়ে। মানুষের জন্য মানুষের মাঝে মনটা যে বড়ো কাঁদে। ইট-পাথরের শক্ত দেয়ালের ফাঁকে এখনো মানুষ নামে, লাখো মানুষ ঘোরে। প্রেম বিলায়, প্রেম জাগায়। সবারে বাস রে ভালো, সেই জানে

 

অলংকরণ :অভিজিত্ চৌধুরী