l মেরিনা আহমেদ
নকশিকাঁথা বাংলার একটি ঐতিহ্যের নাম। নকশিকাঁথাকে বলা যায়, বাংলাদেশের নন্দিত শিল্পের স্মারক। তবে যুগের সাথে যেমন পুরোনো দিনের অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, তেমনি নকশিকাঁথাও হারিয়ে যাচ্ছে। তাই এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মসহ সকল মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য মালেকা খান রচনা করেছেন ‘নকশিকাঁথা’ নামক সচিত্র গ্রন্থ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে নকশিকাঁথা নিয়ে গবেষণা করেন মালেকা খান এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বইটি প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশ। সম্প্রতি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ ও পাক্ষিক ‘অনন্যা’ সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পী হাশেম খান, সাবেক সচিব আক্তারী মমতাজ, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক আব্দুল মান্নান ইলিয়াস প্রমুখ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বইটির লেখক মালেকা খান। আলোচনা পর্ব শেষে সংগীত পরিবেশন করেন ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ খ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীন।
এই গ্রন্থে নকশিকাঁথাকে ঘিরে যেমন আছে তথ্য, তেমনি আছে আবেগ, আছে গল্প, আছে নকশিকাঁথাকে অবলম্বন করে এক নতুন জগত্ গড়ে তোলার হাতছানি। সহজ সরল ভাষায় রচিত এই বইটিতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পী এবং একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের নকশিকাঁথা বোনা নারীর অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া এই বইয়ে রয়েছে ‘বাংলাদেশের নকশিকাঁথা :অতীত দিনের কথা’, ‘নকশিকাঁথা :পথিকৃত্জন’, ‘নারীর অবদান’, ‘কাঁথার সাংস্কৃতিক অবদান’, ‘নকশার শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য’, ‘নকশিকাঁথা :শিল্পও শিল্পী’, ‘নকশার প্রতীক’, ‘কাঁথার মোটিফ’, ‘নকশিকাঁথার ঐতিহ্য’, ‘কথাসাহিত্যে কাঁথা’, ‘একাত্তরে কাঁথার ভূমিকা’সহ মোট ৪০টি বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। নকশিকাঁথার বৈচিত্র্যময় ছবি বইটিকে আরও ঋদ্ধ করেছে। ২৮০ পৃষ্ঠার বইটির দাম
১ হাজার ৫০০ টাকা। বইটি প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশ।
আনিসুজ্জামান
জাতীয় অধ্যাপক
নকশিকাঁথা নিয়ে এর আগে দুটি বই বের হয়েছে। একটি দুই বাংলার নকশিকাঁথা নিয়ে শীলা বসাকের ও আরেকটি ইংরেজিতে মিয়া জামানের লেখা। নকশিকাঁথা একটি জীবন্ত শিল্প। উত্তর ও দক্ষিণ বাংলার নকশিকাঁথার কিছু পার্থক্য আছে। কোনো না কোনোভাবে এটি এখনো টিকে আছে। সবার প্রচেষ্টায় আরও অনেক দিন টিকে থাকবে আশা করি। মালেকা খানের বইটিতে নানা রকম নকশিকাঁথার অনেক ছবি আছে। আশা করি, এটি সবাইকে সমৃদ্ধ করবে।
হাশেম খান
চিত্রশিল্পী
আমাদের আধুনিক শিল্পের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের একটি যোগসূত্র রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ধারায় বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পীদের শিল্পধারা সৃষ্টি হয়েছে। মেয়েদের হাতের রঙিন সুই-সুতার সূক্ষ্ম ফোঁড় নিপুণ শিল্পে পরিণত হয়। গ্রাম বাংলার মেয়েদের শখের বসে করা নকশিকাঁথা এখন বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্য ও লোকশিল্পের চর্চায় প্রশিক্ষণ খুব কঠিন বিষয়। এটা শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে করা যায় না। অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে করার জন্য এখন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতে সহজাত নান্দনিকতা থাকে না। নকশিকাঁথা এতে প্রাণ পায় না।
তাসমিমা হোসেন
সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
নকশিকাঁথা বাংলার ঐতিহ্য। যখন শুনেছি এই নকশিকাঁথা নিয়ে কেউ একজন পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন, তখন একটা দায়িত্ববোধ আর ভালোলাগার জায়গা থেকে আমি তা গ্রন্থাকারে প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছি। নকশিকাঁথা আগে শুধু একটা নির্দিষ্টতায় আটকে ছিল। পারিবারিক প্রয়োজন বা শখের বশে কাজটি করেছে মেয়েরা। তবে এখন অনেকেই করছে ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে। আর এটি প্রশংসনীয়। আগে সুতার ভাঁজে ভাঁজে তাদের সুখ-দুঃখের গল্প থাকত, আর এখন তাতে আত্মোন্নয়নের স্বপ্নও মিশেছে।
মালেকা খান
লেখক
অনেক যত্ন করে এই বই লিখেছি। বইটিতে আমি সব ধরনের তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি—নকশিকাঁথা সেলাইয়ের পর সুইটি কীভাবে রাখা হয়, তাও তুলে ধরতে চেয়েছি। খুটিনাটি অনেক কিছু যোগ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারপরও তো কিছু সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। আশা করছি যারা বইটি পড়বেন, তারা আমার কাজের প্রতি আবেগ ও সততার জায়গাটা বুঝতে পারবেন। চাইলেও একটি বইয়ের মাধ্যমে পুরো ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব না। যেটুকু চেষ্টা করেছি, তা যেন মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করে এটাই আমার কামনা।
আক্তারী মমতাজ
সাবেক সচিব
নকশিকাঁথা দেশের শত শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দেশের সব অঞ্চলেই নকশিকাঁথার প্রচলন রয়েছে। তবে, ময়মনসিংহে এই কাঁথার বৈচিত্র্য বেশি দেখা যায়। ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যাতে নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে এবং নিজেদের ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে বেড়ে উঠতে পারে সেজন্য এসব গবেষণাকর্ম আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মালেকা খান সারাজীবন লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করছেন। জামদানি গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের নিয়েও কাজ করেছেন মালেকা খান।
