ব্রেক্সিটে বাজিমাত ব্রেক্সিটেই কুপোকাত!

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৪

২০১৬ সালের ২৩ জুন ব্রিটেনের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল। এই রায় তখনকার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কপাল পুড়িয়েছিল। আর থেরেসা মে’র ভাগ্য খুলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ব্রেক্সিটেই থেরেসার কপালে আবার দুর্ভাগ্যের রেখা অঙ্কন করে দিচ্ছে। ঘরে-বাইরে ব্যাপক চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। নিজ দলের মধ্যেও নেতৃত্বের সংকটে। অনাস্থা ভোটে তার পক্ষে রায় আসলেও ১১৭ জন এমপি তার নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছেন যা তার জন্য অসম্মানজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি নিজের মন্ত্রিসভার মধ্যেও চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে।

সংকটে থেরেসা মে: আগামী ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য থেরেসা মে যে চুক্তি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছেন, মূলত তা নিয়েই বিভক্তি। ব্রেক্সিট চুক্তি আদৌ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। এরই মধ্যে চুক্তির বিষয়ে ভোট হবার কথা ছিল। কিন্তু নিশ্চিত বাতিল হবে এমন আশঙ্কায় মে ভোট বাতিল করেন। এরপরই তার দলের সংসদ সদস্যদের একটি অংশ তার নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা আনেন। সেই অনাস্থার ওপর ভোট হয়। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে এই যাত্রায় রক্ষা পান মে। থেরেসার ওপর যারা অনাস্থা এনেছেন তাদের মধ্যে ব্রিটিশ মন্ত্রী ওয়েন পিটারসন বলেছেন, চুক্তিটি এতই বাজে হয়েছে যে তা ইশতেহারে উল্লেখ করা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে অনেক রক্ষণশীল নেতাই মে’র পাশে দাঁড়িয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট মনে করেন, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখনই উচিত হয়নি। তিনি মনে করেন, ব্রেক্সিট কার্যকরের জন্য মে-ই সঠিক নেতৃত্ব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তার মতকে সমর্থন করেছেন। থেরেসা মে সব সমস্যা মোকাবিলা করার অঙ্গীকার করে বলেছেন, ‘তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে ব্রেক্সিটের চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে বিরোধী লেবার পার্টির হাতে চলে যাওয়া। এতে ব্রেক্সিট কার্যকর দেরি হতে পারে অথবা থেমে যেতে পারে। ভালো ও খারাপ দুই রকম সময়ের মধ্য দিয়েই গত দুই বছর অতিবাহিত হয়েছে। তবে আমার বিশ্বাস এই চুক্তি সম্ভব’। মে’র ওপর অনাস্থা আনার জন্য বিরোধী শিবিরও উদগ্রীব। বিশেষ করে সবুজ দল ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি জেরেমি করবিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে। তারা চাইছেন, পুরো পার্লামেন্টজুড়ে মে’র নেতৃত্বের প্রশ্ন নিয়ে ভোট হোক। তবে এখন পর্যন্ত তা ঠেকিয়ে রেখেছেন করবিন।

সংকটের মূলে ব্রেক্সিট: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেছেন, ইউরোপ একটা লা কার্টে (কেবল পছন্দমতো জিনিস নেওয়ার) মেন্যু নয়। ফলে ইউরোপের নেতারা যে ব্রিটেনকে ছাড় দিতে রাজি নয় তা ফরাসি প্রেসিডেন্টের কথাই বোঝা যাচ্ছে। ব্রেক্সিট চুক্তি করতে সব দেশের সম্মতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু ইইউ এই বিষয়ে সব দেশের ঐকমত্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্রেক্সিটের পরও অবাধে পণ্য আনা-নেওয়ার সুযোগ চাইছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তবে তাদের জন্য শুধু সুবিধাজনক শর্ত মেনে নিতে নারাজ ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ব্রেক্সিট চুক্তিতে আর কোনো পরিবর্তন হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইইউ নেতারা। তবে তারা ২০২১ সালের আগেই একটি নতুন যুক্তরাজ্য-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন। তারা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি যত দ্রুত সম্ভব সেরে ফেলতে চাইছেন। কারণ ব্রেক্সিটের পরও পেছনের দরজা খোলা রাখার যে‘ব্যাকস্টপ’ পরিকল্পনা নিয়ে এত সমালোচনা, তার ইতি টানা জরুরি মনে করছেন তারা। ব্যাকস্টপ পরিকল্পনাটি হলো- ব্রিটেন বেরিয়ে গেলেও যদি ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ব্রিটেন-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি না হয় তাহলে ব্রিটেন নিয়ন্ত্রিত নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও ইইউ’র সদস্য আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য সীমানা খোলা রাখা হবে।

এই চুক্তির ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের কট্টর রক্ষণশীলদের পক্ষে আনতে রীতিমতো ঘেমে একাকার থেরেসা মে। বিশেষ করে ব্যাকস্টপ পরিকল্পনার সুযোগে যুক্তরাজ্যের ওপর ইইউ নানা নীতি বা সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য চাপিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কনজারভেটিভ পার্টির এমপিরা। মে ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের কাছে, ‘আইনি ও রাজনৈতিক আশ্বাস’ চেয়েছেন যেন ব্যাকস্টপ পরিকল্পনাটি স্বল্পস্থায়ী হয়। কিন্তু সম্মেলনে ইইউ নেতারা বলেন, ঠিক               কী ধরনের আশ্বাস ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চাইছেন তা তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

সামনে যা হতে পারে: অর্থমন্ত্রীসহ পাঁচ মন্ত্রী দ্বিতীয় গণভোটের আশা করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ তিন মন্ত্রী চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিটের পক্ষে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দুইজন চান সফট ব্রেক্সিট। তারা নরওয়ের মতো চাইছেন। অর্থাত্ ইইউ ত্যাগ করলেও ব্রিটেন যেন ইইউ’র অর্থনৈতিক অঞ্চলের সদস্য থাকে। আগামী ২১ জানুয়ারির মধ্যে থেরেসা মে কে চুক্তিটি পার্লামেন্টে পাস করাতে হবে। না হলে নতুন চুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। যদি বর্তমান কিংবা নতুন চুক্তি পার্লামেন্টে পাস হয় তাহলে ২৯ মার্চের মধ্যে ব্রেক্সিট কার্যকর হবে। পাস না হলে নতুন নির্বাচন দিতে হতে পারে। এছাড়া চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট হতে পারে, সমঝোতা নিয়ে বিলম্ব ঘটানো যেতে পারে এবং দ্বিতীয় গণভোট হতে পারে।