তারুণ্য, মুক্তিযুদ্ধ এবং আসন্ন নির্বাচন

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৫

বাংলাদেশে বর্তমান তারুণ্যের শহিদ-জননী জাহানারা ইমামের ‘গণ-আদালত’-এ অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি। কিন্তু বর্তমান তারুণ্যতো ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-এ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। এই আন্দোলনের আবেদন ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীতে যেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী আছে এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী, সেখানেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে প্রতীকী গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। অর্থাত্ তারুণ্য এখনো মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই আছে। তবে সেটা হয়তো রণাঙ্গনে নয়, চেতনায় উজ্জীবিত। আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন তারুণ্যকে তাদের চেতনার মুক্তিযুদ্ধে, আদর্শের মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে। আর সেটা সম্ভব করার জন্য তাদের শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ। তার মধ্যে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি তরুণ ভোটার। প্রায় দেড় কোটি ভোটার আছেন, যারা জীবনে কখনো ভোট দেননি। আবার দুই কোটি ২০ থেকে ২১ লাখ ভোটার আছেন, যারা কখনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটদানে অংশগ্রহণ করেননি। সুতরাং এবারের নির্বাচনে বিজয় মানেই হলো তারুণ্যের বিজয়। আমার বিশ্বাস, তারুণ্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে ভোট দিবে। বাংলাদেশের মানুষ এবার আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে আনবে। কারণ আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র দেশের সার্বভৌমত্বকেই শক্তিশালী করেনি, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক এবং মানবিকতার দিক থেকে সারাবিশ্বের জন্য একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ পৃথিবীতে মানবিকতার ক্ষেত্রে এখন একটি নেতৃত্বদানকারী জাতি হিসেবে পরিচিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণভাবে সমুদ্র বিজয় করেছে, স্থল বিজয় করেছে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে, আর আকাশ বিজয় করেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণের মাধ্যমে। এই জল, স্থল ও আকাশ বিজয় হয়েছে বিগত ১০ বছরে।

বাংলাদেশে এখন শতকরা ৪০ ভাগ তরুণ প্রজন্ম আর এবারের নির্বাচনে তারুণ্যের স্লোগান: ‘আমরা বাংলার বাঘ, আমরা সাহসী। আমরা ভোট দিবো শান্তিপূর্ণভাবে শান্তিপ্রিয় প্রার্থীকে।’ এবার তারুণ্য অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী ও উজ্জীবিত আর তাদের এই আত্মবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে যা আরও উজ্জীবিত হয়েছে ‘Let’s Talk with Sheikh Hasina’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যা গত ২৩ নভেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের ১৫০ জন তরুণ— যারা ইতোমধ্যে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মতবিনিময় করেছেন দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে। তিনি তাদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, জানতে চেয়েছেন যে, তারা কেমন বাংলাদেশ চায়। তরুণরা সরাসরি তাদের প্রত্যাশার কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাদের কথা দিয়েছেন তাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে দেবেন—  দেশের যুবসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে। প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বাংলাদেশের জন্য যা কিছু করছেন তা তারুণ্যের জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্যই করছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে চলেছেন আর এই উন্নয়নের পরিকল্পনা নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গটা উঠে আসে। তিনি তরুণীদের আত্মবিশ্বাসী হতে বলেছেন। মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের প্রয়োজন স্কুলজীবন থেকে এবং ছেলেদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন আছে। তাহলেই তারুণ্য একে-অন্যের পরিপূরক হিসেবে দেশের উন্নয়ন করতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনায় নারী-পুরুষের সমান সুযোগ থাকবে। একটা ছেলে ও একটা মেয়ে নিয়ে যৌথভাবে উদ্যোক্তাশ্রেণি সৃষ্টি করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা জামানতে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। ৮টি ইপিজেডের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হবে। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের যদি উন্নয়ন হয় সেটা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নকেই নিশ্চিত করবে। তিনি শুধুমাত্র গণভবনেই তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করেননি, বস্তিবাসী তারুণ্যের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন। তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো শুনেছেন, জেনেছেন, অনুভব করেছেন, সমস্যার সমাধান দিয়ে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যত্ পরিকল্পনায় বস্তিবাসী তারুণ্যের সমস্যা সমাধানে দিকনির্দেশনা থাকবে। তারুণ্যকে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে বলেছেন। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে বলেছেন, হতাশা ভুলে ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগাতে বলেছেন। সর্বশেষ, তারুণ্যের প্রতি তার উপদেশ:“তোমরাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তোমাদের হাতেই বাংলাদেশকে তুলে দিলাম”। অর্থাত্ দেশ ও জাতির উন্নয়ন দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম শুধু দাবি করলেই হবে না, দেশ গড়ার ও উন্নয়নের দায়িত্বও নিতে হবে। আর এই ধরনের অনুপ্রেরণা শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই দেয়া সম্ভব। কারণ তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিজের প্রায় পুরো পরিবার হারিয়েও বাংলাদেশকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তার তুলনা বিরল। বাংলাদেশে এবার শুধু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই হচ্ছে না, এই নির্বাচন একটি সফল অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনও হতে যাচ্ছে। ৩০০ আসনের বিপরীতে ১৮৪১ জন প্রার্থী এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, যাদের মধ্যে ১৭৪৫ জন দলীয় প্রার্থী এবং ৯৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

তারুণ্যের প্রধান দাবি— কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং চাকরির আবেদনপত্রে কোনো ফি থাকবে না। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় শতভাগ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। সরকার শুধুমাত্র তরুণদের কর্মসংস্থানের দায়িত্বই নিচ্ছে না, সাথে সাথে উদ্যোক্তা শ্রেণিও সৃষ্টি করবে। এই উদ্যোক্তা শ্রেণি নিজেদের কর্মসংস্থান করবে এবং অন্যের জন্যও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। তবে তার জন্য আরও একটু সময় দিতে হবে। কারণ গত ১০ বছর ধরে সরকার ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। এবার সরকার তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষিত মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করবে আর এই কাজে সরকারের সব থেকে বড় শক্তিই হবে এই তারুণ্য। এই তারুণ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা হবে—যাদের মূল লক্ষ্য হবে জনকল্যাণ করা এবং বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। একবিংশ শতাব্দীর তারুণ্য দেশ ও জাতির প্রতি অনেক বেশি দায়িত্বশীল। বিংশ শতাব্দীর তারুণ্য বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘দেশে কাজের পরিবেশ নেই’ বলে বিদেশেই থেকে গেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তারুণ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশে ফিরে আসছে, দেশে নিজেরাই কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে নিচ্ছে। তাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ গড়ার কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ নামক শব্দটা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রায় বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। বিদেশে শ্রম বাজার সৃষ্টির মানে ব্রেইন ড্রেইন নয়, আমরা ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ শ্রমিক ও তাদের জন্য শ্রম বাজার সৃষ্টি করতে চাই, ব্রেইন ড্রেইন হোক আমরা চাই না। দেশে মানব সম্পদের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। আর এই ব্যাপারে তারুণ্য ও বর্তমান সরকার একমত। আমরা আমাদের মানবসম্পদের যোগ্যতা ও গুণাবলি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চাই যে, জাতি হিসেবে আমরা কতটা সত্, যোগ্য এবং পেশাগত দায়িত্বের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পৃথিবীতে যেখানেই বাংলাদেশের তারুণ্য অবস্থান করছে, সেখানেই তারা তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছে।

n লেখক: অধ্যাপক ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া