বে ড়া নো

নিঝুম দ্বীপের গহীন বনে

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৪০

l মো. জাভেদ হাকিম

 

নিঝুম দ্বীপ নাম নিলেই গা ছম ছম করে। সরকারিভাবে এই দ্বীপের নাম চর ওসমান। আমাদের এবারের ভ্রমণ ছিল নিঝুম দ্বীপে। সন্ধ্যা ৭টায় সদরঘাট থেকে লঞ্চ যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরের দিন সকাল ৯টায় গিয়ে পৌঁছে ছিলাম নোয়াখালি জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত ইউনিয়ন চর তমুরুদ্দি। এই দীর্ঘ লঞ্চ ভ্রমণে আমাদের আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন পানামা লঞ্চের তত্ত্বাবধানকারী শাহিন ও সোহাগ। চর তমুরুদ্দি গিয়ে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হলো। এই অবসরে দে ছুট ভ্রমণ সংঘের চর তমরুদ্দি ঘুরে দেখা হয়ে গেল। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জোয়ার এলো। ইঞ্জিন চালিত বোটে করে ছুটছি এবার নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশে। টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা মেঘনা নদী পারি দিয়ে প্রায় সন্ধ্যায় পৌঁছালাম নিঝুম দ্বীপে। আগে থেকেই নিঝুম রিসোর্ট বুকিং করা ছিল। রাত হয়ে যাওয়ায় সেদিন আশপাশটা ঘুরে, শহীদের হোটেলে গরম গরম ইলিশ ভাজা দিয়ে খাবার খেয়ে রিসোর্টে ফিরে এলাম। রিসোর্টের পরিবেশ বেশ চমত্কার। মেঘহীন তারা ভরা আকাশ, চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জেগে আছি আমরা কজন, রাতের সৌন্দর্য চোখে মেখে।

পরের দিন খুব ভোরে বের হয়ে গেলাম দ্বীপের বন্দর টিলার উদ্দেশে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে পৌঁছালাম বন্দর টিলার নীরব কেওড়া বনে। সুনসান চারপাশ। মাঝেমধ্যে কেওড়া ফলের টুপ করে ঝরে পড়া সেই নীরবতাকে আরও গাঢ় করে তোলে। ‘নিঝুম’ নামের সার্থকতা সম্ভবত একারণেই। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ায় ম্যানগ্রোভগুলোকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। 

এরমধ্যে রাতে বারবিকিউ করার জন্য ফেরার পথে একটি খাসি কেনা হলো। দ্বীপের বাসিন্দা ১৩-১৪ বছরের ছেলে রিয়াজ আমাদের গাইড। বয়সে ছোট হলেও গাইড হিসেবে সে দারুণ। ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে মোক্তাইরার খাল দিয়ে যাচ্ছি। দুপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য খুবই উপভোগ্য। খালের মাথায় ডিঙ্গি ভিড়ালো গাইড। বনের কিছুটা ভিতরে গেলেই ঝাঁকে ঝাঁকে চিত্রা হরিণের পাল দেখা গেল। তবে ক্যামেরা তাক করার আগেই লাপাত্তা হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে তত্কালীন জনৈক বন প্রতিমন্ত্রী বন বিভাগের মাধ্যমে প্রথমে সাতটি, পরে আরও ১০টি হরিণ অবমুক্ত করেছিলেন। সেই সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় ২৭,০০০ হরিণ রয়েছে এই দ্বীপে। এই বনে শিয়াল-কুকুর ছাড়া হিংস্র কোনো জন্তু নেই, তাই নির্ভয়ে বনের ভিতরে ঘুরে বেড়ানো যায়। নিঝুম দ্বীপের আয়তন প্রায় দশ হাজার একর। জনসংখ্যা প্রায় ত্রিশ হাজার। দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্ব ও পশ্চিমে মেঘনা নদী দ্বারা বেষ্টিত এই নিঝুম দ্বীপ। সরকার ইচ্ছে করলে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন ঘটিয়ে নিঝুম দ্বীপকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারে। দেশ ও বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করার মতো রয়েছে নয়ন জুড়ানো সব নিসর্গের ছোঁয়া।

 

  যো গা যো গ

ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে টিপু ও পানামা নামের লঞ্চ একদিন অন্তর অন্তর বিকাল ৫টায় হাতিয়ার চর তমুরুদ্দির উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ইদানীং আরও দুটো কোম্পানির লঞ্চ নিঝুম দ্বীপের জাহাজমারা ঘাট পর্যন্ত চলাচল করে। সড়ক পথেও যাওয়া যায়, তবে নৌপথে আরামদায়ক। চর তমুরুদ্দি থেকে ট্রলারে (স্থানীয় ভাষায় টেম্পু) যেতে হয় নিঝুম দ্বীপ। রাতে থাকার মতো বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। ইলিশ ভাজার স্বাদ নেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি খাবার হোটেল আছে।