সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে মালয়েশিয়া

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৭

মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রতিবেশী সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে জড়িয়েছে তার দেশ। মালয়েশিয়া সম্প্রতি একটি বন্দর সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সিঙ্গাপুর এতে আপত্তি জানিয়ে বলেছে, এটি তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করবে। দুদেশের পারস্পরিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া সীমান্ত দ্বন্দ্বের বিষয়টি হালে যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাচ্ছে, সমস্যাটি নতুন কোনো ইস্যু নয়। ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার থেকে আলাদা হওয়ার সময় থেকে সীমান্ত নির্ধারণে কিছু বিষয় অমীমাংসিত ছিল। অতীতে সময় সময় সীমান্ত বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। পুরনো সমস্যাটি সমাধানের জন্য সময় সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী কোনো ফল আনেনি। বরং দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খোরাক যুগিয়েছে ইস্যুটি। মাহাথির ইতোপূর্বে (১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে দুদেশের মধ্যে অনেকবারই দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। নাজিব রাজাক প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। চলতি বছর মে মাসে নির্বাচনে নাজিবকে হারিয়ে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হন। যদিও উত্তেজনা প্রশমনের জন্য উভয় তরফে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিন্তু সমস্যাটি ছাই চাপা আগুনের মতো রয়েই গেছে।

৪ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার সর্বদক্ষিণের রাজ্য জোহর বারু বন্দর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ঘোষণা করলে সিঙ্গাপুর তার প্রতিবাদ জানায়। সিঙ্গাপুরের অভিযোগ, ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে তুয়াস অঞ্চলে তাদের আন্তর্জাতিক জলসীমার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হবে। সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়াকে তাদের বন্দরের সমপ্রসারণ থেকে সরে যেতে এবং একতরফাভাবে পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করে। জবাবে মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্টোনি লোক সিউ ফুক সিঙ্গাপুরের দাবিকে ঠিক নয় বলে অভিহিত করে বলেন, সংস্কার করা বন্দরটির সীমা সিঙ্গাপুরের সম্প্রসারিত হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি সীমার অতিরিক্ত অংশের ওপর সিঙ্গাপুরের দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, বন্দর সম্প্রসারণের ফলে আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর সিঙ্গাপুরের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি।

দুদেশের সম্পর্কে কিছু অমীমাংসিত আগে থেকেই ছিল যা পরবর্তীতে দু্ই প্রতিবেশী দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পথের কাটা হয়েছে। সর্বশেষ এ বিরোধের সূচনা মূলত ২০০২ সালে। সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার জোহর বন্দর সংলগ্ন অংশে নিজের অধিকার দাবি করে। মাহাথির তখন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। প্রতিবাদ জানিয়েছিল মাহাথির সরকার। মালয়েশিয়া বিরোধ মিটিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেও সিঙ্গাপুর সাড়া দেয়নি। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে দুদেশের মধ্যে সীমান্ত বিষয়ক একটি চুক্তি হয়, বলা হয়েছিল কোনো দেশ একতরফাভাবে সীমানায় পরিবর্তন করবে না। সিঙ্গাপুরের ক্রমাগত অনমনীয় অবস্থানের মুখে মালয়েশিয়া ২০০৩ সালে বিষয়টি নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইবুনাল ফর দি ল’ অব দি সি’র (আইটিএলওএস) দ্বারস্থ হয়। আইটিএলওএস সিঙ্গাপুরের ওপর কয়েকটি শর্ত আরোপ করে অন্যদিকে উভয় দেশকে গ্রুপ অব এক্সপার্ট (জিওই) গঠন করার নির্দেশ দেয়। ২০০৪ সালের নভেম্বরে জিওই গঠিত হয় এবং পরের বছর দুদেশের একটি চুক্তি হয় যার মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুর জোহর প্রণালির আশেপাশের অংশের ওপর দাবি করা থেকে সরে আসে। এরপর মোটামুটি এক দশকের বেশি সময় বড় কোনো মতানৈক্য ঘটেনি। ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর মালয়েশিয়ার ফেডারেল সরকার যে গেজেট প্রকাশ করে তাতে জোহর বারু পোর্টের সীমানা পরিবর্তনের ঘোষণা ছিল। এর জবাবে ৫ নভেম্বর সিঙ্গাপুর কুয়ালালামপুরের কাছে একটি ডিপলোমেটিক নোট পাঠায়। মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরের আপত্তিকে এখনো পর্যন্ত গ্রাহ্য করছে না। উভয় পক্ষ তাদের দাবিতে অনড় থাকলেও মাহাথিরের সরকার বলেছে তারা বিষয়টি নিয়ে জরিপ করতে রাজি আছে। সিঙ্গাপুর অবশ্য এতে রাজি হয়নি। ১০ ডিসেম্বর মাহাথির বলেন, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার দেশের নৌযানগুলো বিতর্কিত জলসীমায় অবস্থান করবে। ১৩ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জাতিসংঘের কনভেনশস অব দি ল্য অব সি’তে (আনক্লস) অভিযোগ করে বলে যে মালয়েশিয়া একতরফাভাবে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে সালিশের জন্য যেতে পারে না।

মাহাথির পুনরায় ক্ষমতায় এসে সিঙ্গাপুরের জন্য সবকিছু কঠিন করে দিচ্ছেন অনেকে মনে করেন। যেমন দুই দেশকে সংযুক্তকারী দ্রুত গতির রেল যোগাযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। আদর্শবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত মাহাথিরের বরাবরই সিঙ্গাপুরের প্রতি রয়েছে অনীহা। হতে পারে এটি তার ছাত্রজীবনের স্মৃতি থেকে উত্সারিত। অথবা ১৯৬৫ সালের আগস্টে মালয়েশিয়ান কনফেডারেশন থেকে সিঙ্গাপুরের বেরিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া। যে প্রতিক্রিয়া তিনি ৫০ বছর পরও পুষে রেখেছেন। মাহাথির সিঙ্গাপুরের কিং এডওয়ার্ড কলেজ অব মেডিসিনে লেখাপড়া করেছেন। সেখানে পড়ার সময় তিনি দেখেন কিভাবে মালয় শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। দুদেশের মধ্যে পরবর্তী সময়ে সমুদ্র ও আকাশ    সীমা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। অনেকের প্রত্যাশা মাহাথির অন্তত এখন একজন বর্ষীয়ান রাষ্ট্রনায়কের মতো প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে উত্তেজনার পথ পরিহার করবেন। মাহাথির সরকারের সামনে এখন অনেক কাজ রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে তার প্রশাসনের ওপর এখন বিশাল অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝা। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমা রেখে কুয়ালালামপুরের উচিত অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর দিকে            দৃষ্টি দেওয়া।