অনিকেতের অণুগল্প

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:০৭

উত্পল দত্ত

এক.

আমার রোদ্দুর ভালো লাগে। এখানে বেশি ছায়া। অন্ধকারের মতো। বসবো না। উঁহু বসবো না। কোমর ধরে, বুক-পিঠ টানটান করে উঠে দাঁড়াল কমল।

সচকি? আফসানা। হাত ধরে টেনেটুনে আবার কমলকে বাঁশের বেঞ্চিতে কোনোমতে বসিয়ে দিল। আড় চোখে সে চারপাশ দেখে। তার হরিণ-চোখ উপগ্রহের মতো কক্ষপথ ঘুরে এল। কক্ষপথে মানুষের ঢল। চোখ ফিরিয়ে আফসানা বলে, 

পাঁচ মিনিট। মাত্র পাঁচ মিনিট এখানে বসো প্লিজ! তারপর তুমি যেখানে বসতে চাও সেখানেই বসবো। হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে দাঁড়ানো কমলকে সংকেত দিল সে। পাঁচ মিনিটের নিশ্চয়তা। কমলের মুখ তবুও বিরস। যেন কোমরে ব্যথা তার। দুই হাতে কোমর আঁকড়ে ধরে এলিয়ে নেতিয়ে বসে পড়ল কমল।

নিজের ঠোঁট নিজেই কামড়ায় সে। এটা কমলের অভ্যাস। মতবিরোধ হলেই দাঁত বসায় নিজের ঠোঁটে।

আফসানার সাথে তার মেলামেশা বেশিদিনের নয়। আফসানা স্বভাবে ইনটুইটিভ। ‘ক’ বলতে না বলতেই কলা ও কমলার পার্থক্য বিচার করে ফেলে সে।

যা বোঝার তা আফসানা বুঝে গেছে। কমল তাকিয়ে আছে যে দিকটায় সেখানে মানুষের ভিড়। তার মানে কমলের নজর ভিড়ের দিকে, ওখানেই যাবার শখ হয়েছে তার। নদীর ওপর নতুন ব্রিজ। অনেক চেনামুখ, অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে সেখানে। সারাদিনের তাপ নদীর ভেজা আর ঠাণ্ডা হাওয়া মুছে দিয়ে যায়।

ব্রিজের ওপর তাই মানুষ গিজগিজ করছে। স্নেহের মতো শীতল প্রলেপের জন্য মুখিয়ে থাকে সবাই।

বিকেল-সন্ধ্যায় বেথুয়া নদীর তীরে ভিড় বেড়ে যায়। ওপারে একসময় ঘন বাঁশঝাড়ের নিচে মানুষের থোক থোক বসতি ছিল। এপার-ওপার হতো খেয়া নৌকায়। এখন কংক্রিটের ব্রিজ হয়েছে। ওপারে বিনোদনের স্পেস আছে। কাবাব-তন্দুরির রেস্টুরেন্ট। সন্ধ্যার পর সব আলো জ্বলে উঠলে নাইটক্লাবের সাকোডেলিক লাইটের মতো দেখায়।

এপারে চানাচুর, বাদাম বিক্রেতা। আধুনিক মোড়কে চটপটি-ফুচকা। গরমে কাতর মানুষ ছোট শহরের ক্লান্তি নিয়ে ব্রিজের ওপর ঠাসাঠাসি করছে। তারই মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনমেলা। কেউ খোলামেলা। কেউ আড়াল খোঁজে।

আফসানা আড়াল-খোঁজার দলে পড়ে। লজ্জায় নয়, সংশয়ে।

এখনো আলো আছে। সন্ধ্যা নামেনি। সংশয় থামিয়ে রাখে আফসানাকে। চারপাশে পরিচিত মুখ। একটু আগে বাদল কাকা বাইসাইকেলে ওদিকে গেছে। আফসানার চোখে পড়েছে ঠিকই। ব্রিজের দিকেই বাদল কাকা গেল । হাওয়া ওখানেই খেলে। গা জুড়িয়ে যায়। এখানে আসার সময় পাশের বাড়ির চঞ্চল আর ইয়াকুব চাচাকেও রিকশায় আসতে দেখেছে আফসানা।

চিন্তায় পড়ল সে। কমলকে জোরাজুরি করে লাভ নেই। তার একরোখা মনোজগেক গ্রহলোকের মতো অল্পকাল হলেও পরিভ্রমণ করে এসেছে আফসানা। একটু আলো-আঁধারির জন্য এই মুহূর্তে সে কাতর। আলো পড়ে এলেই অন্য কোথাও বসা যাবে। ব্রিজের ওপরেও যাওয়া যাবে।

মুখচেনার ভয় ও বাতিক আফসানার নেই, নিজের হূদয় নিয়েই সংশয়ে আকুল সে। হূদয়ের হাহাকার অন্য চোখ পড়ে ফেলুক তা সে চায় না। তাই সে সন্ধ্যা নামার প্রতীক্ষায় ছিল। আফসানার বয়স আঠারো প্লাস। উনিশ ছুঁই-ছুঁই। সংশয় তাকে সাবালিকা হতে দেয়নি। কমলের জন্য তার হাহাকার প্রেমের বৃত্তে পড়ে কি না সে তা এখনো জানে না। শুধু তরঙ্গ বোঝে সে। রক্তে তরঙ্গ, ঢেউয়ের চোরাটান ভালো কথা নয়। তবু বানভাসির মতো ভেসে যায় সে। যখন মনে পড়ে কমলের সাদাসিধে মুখ, শক্ত চোয়াল, টাল সামলাতে পারে না আফসানা।

চলো উঠি। ভাল্লাগে না, আবার তাড়া দেয় কমল। ছটফট করে। ওরা বসেছিল চায়ের দোকানের পেছনে নদীর তীরঘেঁষে একটি চৌকো জায়গায়। পেছনে বাঁশের বেড়ায় টিনের চালাঘর নিয়ে চা-সিঙারার রেস্টুরেন্ট। সামনে নদী। হেলেপড়া সূর্যের আলো বিনয়ী কুসুমের মতো। ওই সূর্য-কুসুম এখন পশ্চিমে। ওদের সামনে নদী, বইছে দক্ষিণে। এখানে সূর্যাস্তের আগেই রহস্যময় নিবিড় ছায়া। তাকে অন্ধকার বলা যায় না। ছায়াও বলা যায় না। আফসানা তাই ঘোরে ডুবেছিল।

তুমি থাকো। আমি যাই, এবার সটান উঠে দাঁড়াল কমল।

ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটি ঘটল। বাঁশের বেঞ্চি থেকে ধপাস করে পড়ে গেল আফসানা। চৌকো জায়গায় বালু আর ঘাসের মধ্যে মূর্চ্ছা গেছে সে। প্রথমে চমকে উঠেছিল কমল, মুহূর্তমাত্র। কমল ভাবল, এরকম হয়, মেয়েরা মাঝে-মধ্যে মূর্চ্ছা যায়। কেন যায়, অতশত ভেবে দেখেনি। কমল ছুটল রেস্টুরেন্টের দিকে জলের খোঁজে। জলের ঝাপটায় ঠিক উঠে বসবে আফসানা।

 জগভরতি জলে হাত ডুবিয়ে আফসানার চোখেমুখে সজোরে ছিটাতে লাগল কমল। আফসানা নিথর। সে চোখ খোলে না। এরকম অভিজ্ঞতা কমলের আগে ছিল না। সে দেখেছে, জলের ঝাপটে ঠিক চোখ খুলে যায়। মেয়েরা উঠে বসে হেলদোল খায়। তারপর বলে, আমার কী হয়েছিল!

ভারি বিপদ, আফসানা চোখ খোলে না। কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না।

ও আফসানা, তাড়াতাড়ি জেগে ওঠো, মনে মনে আওড়ায় সে।

বিপাকে পড়েছে কমল নিজেই এখন। আফসানার পালস দেখল। কিছুই ঠাহর করতে পারল না। আফসানার বুকের ওঠাপড়া বন্ধ। যেন সে তিন দিন আগেই মরে গেছে। আফসানা এখন শুধু নিথর নয়, পাথর। তার দুই হাত দুই দিকে ছড়ানো। ডান হাতটি একটি কাঁটা-লতার ওপর পড়েছে। বিছুটিলতা নাকি! কমল চমকায়। ফরসা আফসানার হাত আলগোছে নিজের হাতে তুলে নিলো। কব্জির নিচে ছোপ ছোপ লাল দাগ। অস্তগামী সূর্যের মতোই তার রং।

কমল বিহ্বল। টোটালি কনফিউজড। এবার সে নিজেই অন্ধকারের অপেক্ষায় থাকে। সদর হাসপাতালে নিতে হবে আফসানাকে। ভাগ্যিস, এখনো রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে কেউ উঁকিঝুঁকি দেয়নি। জলের জগ হাতে এদিক-ওদিক তাকায় সে। আরেক জগ জল ঢেলে দেবে নাকি আফসানার মুখে, যদি জ্ঞান ফেরে! আফসানা এখন তার কাছে শুধুই পাথর। পাথর দিয়ে কমল কী করবে!

সামনে উনিশ বছরের মেয়ে চিত্পাত শুয়ে আছে, তার পাশেই কমল দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটি ভাবা যায় না! এরকম আগে হয়নি তার। রাজধানীর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটেতে ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে পড়ে সে। কিন্তু বাস্তবে নিজে নায়ক হয়ে এরকম চিত্রনাট্যের জন্ম দিতে চায়নি কখনো।

‘হোয়াট দ্য হেল ইউ আর ডুয়িং হেয়ার’, কথাটা কে যেন তার কানে ঢেলে দেয়। ‘আই অ্যাম উইথ অ্যান অর্থোডক্স ভার্জিন গার্ল’, ফেঁসে গেছি, নিজের মনে উত্তর আওড়ায় কমল।

ছেলেখেলা। ছেলেখেলা।

না না এখন ছেলেখেলার সময় নয়। উঁহু একদম নয়।

পেছনের রেস্টুরেন্টে খদ্দের বেড়েছে। গুঞ্জন কানে আসে। চায়ের কাপ ও চামচের ঠুনঠুন আওয়াজ।

কমলের হাতে সস্তা জলের জগ। সেদিকে তাকিয়ে আরেক আশঙ্কা ঘনিয়ে আসে। জলের জগের খোঁজ পড়তে পারে! রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে কেউ পেছন দিকটায় আসতেই পারে! ফিল্ম স্টাডিজ পড়া স্মার্ট কমল কুঁজো হয়ে জলের জগটি নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে। তেষ্টা পেয়েছে খুব। তবু তেষ্টা গোপন রেখে চারপাশ পরখ করে সে। সবাই ব্যস্ত। এই টেবিলে ওই টেবিলে চা ও সিঙারা। সিগারেটের ধোঁয়া। কারও ফুরসত নেই। সন্ধ্যা নেমেছে। এসময় বকের ঝাঁকের মতো খদ্দের ঢোকে। চা খায়। সিগারেট ধরায়। পরিস্থিতির আঁচ-অনুমান করে ফিরে আসে কমল।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। বাঁশের বেঞ্চিতে আগের মতোই বসে আছে আফসানা। ঠিক আগের মতোই। মাঝখানে ঘটে গেল যা, তা কি স্বপ্ন-কল্পনা!

সূর্য ডুবে গেছে। তবু আলো আছে। সামনে নদী। রেস্টুরেন্টের আলো এসে পড়েছে। ওই আলোয় আফসানাকে আরো স্বচ্ছন্দ দেখায়। স্মিত মুখে নদী দেখছে সে। তার মুখে এক টুকরো লাল ছোপ থাকতেও পারে। আরেকটু আলো থাকলে কমল তা পড়তে পারত। তবে এটা বোঝা যায়, আফসানা হাসছে। কমল তড়িঘড়ি করে ছুটে আসে আফসানার কাছে।

কী হয়েছিল তোমার! পড়ে গিয়েছিলে কেন! আমি তো—

পড়ে গিয়েছিলাম? কখন পড়ে গিয়েছিলাম! আফসানা অবাক।

আহা তুমি বুঝতে পারছো না। এরকমই হয় বোঝা যায় না। তুমি তো জ্ঞান হারিয়ে এই যে এইখানে শুয়েছিলে! বালুর মধ্যে আঙুলে দাগ কেটে দেখায় অস্থির কমল।

তা-ই! পড়ে গিয়েছিলাম! মনে পড়ছে না তো!

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কমল। মেয়েদের এরকমই হয়। মনে থাকে না। সে আগেও দেখেছে।

তাই জোর দিয়ে বলে, সত্যি তুমি পড়ে গিয়েছিলে। হ্যাঁ, এই দেখো তোমার তোমার ডান হাত লাল হয়ে আছে।

আফসানার ডান হাত খুঁজে দেখল কমল—কোনো লাল রং নেই। 

কোথায় লাল রং! আফসানা অবাক।

আলো কম তাই দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া...

তাছাড়া কী, আফসানা জানতে উত্সুক।

ঘাসের ওপর পড়েছিল হয়তো মিলিয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম বিছুটিলতা। সরিয়ে দিয়েছিলাম।

তা-ই নাকি! বিছুটিলতা! কোথায় দেখছি না তো। বিছুটিলতা হলে মিলিয়ে যেত না। চুলকানি হতো। আফসানা ফিসফিসিয়ে বলে।

চলো ব্রিজের দিকে যাই বলেই আফসানা উঠে পড়ল।

না থাক এখানেই বসি। এখন তো আর রোদ নেই। দাঁড়াও ওরকম হলে গরম কিছু খেতে হয়। কোমরের জিনস টেনে তুলে রেস্টুরেন্টে এবার নিশ্চিন্তে ঢুকে পড়ে কমল। ভয়ডর কেটে গেছে। সন্ধ্যা হলেও গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে এখানে অনেকেই বসে। মফস্বল হলেও এই দৃশ্যে সবাই অভ্যস্ত। সবার চোখে তা সয়ে গেছে। এবার আফসানার সাথে গল্প-গুজবে জমে যাবে সে। কতদিন পর দেখা।

রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে দুই কাপ গরম চা নিয়ে এল কমল।

চায়ে হালকা চুমুক দিয়ে, আফসানা শান্ত স্বরে বলল, বিছুটিলতার কথা কী যেন বলছিলে!

প্রতিবাদের সুর কমলের কণ্ঠে, না না বিছুটিলতা নয়, ওই লতা তো...

ওই লতার কথা নয় আমি আমার কথা বলছি! আফসানার কণ্ঠ বদলে গেছে।

মানে! চায়ে চুমুক দিতে যাচ্ছিল কমল, কাপ নামিয়ে আনে হাঁটুর কাছে।

মানে খুব সোজা। ধরে নাও আমিই বিছুটিলতা।

অ্যা! আমি কিছুই বুঝতে... কথা গলায় আটকে যায়, শেষ করতে পারে না সে।

বিছুটিলতা। বিছুটিলতা, বলে নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে আফসানা বলল, আমাকে দেখো আমি নিজেই বিছুটিলতা।

জ্ঞান হারাইনি। ভান করে পড়েছিলাম। ওই যে ওইখানে। চায়ের কাপ সেখানে উপুড় করে ঢেলে দেয় আফসানা।

কমল তার চায়ের কাপ হাতে বেঞ্চির ওপর কাদামাটির মূর্তি তখন।

ভুরু কোঁচকায় আফসানা। ফুঁসছে সে। রেস্টুরেন্টের বেড়ার ফাঁক গলিয়ে একটু কৃপণ আলো আফসানার মুখে এসে পড়েছিল। প্রথমবারের মতো অন্য এক আফসানার মুখ এক ফালি আলোতে দেখল সে। দুই ভুরুর মাঝখানে ভাঁজ। সেই ভাঁজ সাপের লেজের মতো দেখায়। তবু আফসানা কী সুন্দর। হয়তো ওই সাপের লেজের ভাঁজ তাকে ডাগর বেদেনির মতো মোহনীয় করে তুলেছে। বেদেনি নিয়ে একটি ডকুফিকশন করার কথা অনেকদিন থেকেই ভাবছিল সে। মানানসই চরিত্র দরকার। এখন মনে হলো, ‘আফসানা ইজ পারফেক্ট’।

চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে কমলের কাছে এগিয়ে এল আফসানা। পরের ঘটনাটির জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। দুই আঙুলে কমলের চোয়াল চেপে ধরল আফসানা, চোয়াল ফুটো করে দেবে সে। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠার কথা কমলের, কিন্তু কোনো শব্দ করার সাহস পেল না।

তোর ওই শক্ত চোয়াল থেকে আমাকে মুক্তি দে, বল দিবি না!

বালকের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে সায় দেয় কমল। তার পুরুষোচিত চোয়ালের প্রশংসা সে আগেও শুনেছে। বীথির মুখে শুনেছে। শায়লার মুখে শুনেছে। এখন শুনল আফসানার মুখে। আফসানা চোয়াল ছেড়ে দিলে চোয়ালে হাত বোলায় কমল, আফসানার হাতের আঙুলে এত জোর। কমলের ভয় ভয় করে।

তুমি ছেড়ে তুই তুই করে কথা বলতে শুরু করেছে আফসানা! কী আছে আফসানার মনে, একটু আগের মূর্চ্ছা যাওয়া, বিছুটিলতার কাহিনি, কিছুই মেলাতে পারে না সে। বীথি আর শায়লা এরকম নয়। আফসানা মুক্তি চাইছে কেন!

উত্তর না দিয়ে কমল চুপ করে থাকে।

আবার ফোঁস করে উঠল আফসানা, তুই আমাকে মুক্তি দেওয়ার কে? আমার মুক্তি আমার কাছে আছে।

কমলের চিন্তা এবার বাঁক খায়। বীথি আর শায়লার ব্যাপারটি কি আফসানা জেনে গেল! বীথি আর শায়লা তো তার ঢাকার গার্লফ্রেন্ড। তাদের কথা মফস্বলের বাড়িতে আফসানার জানার কথা নয়! বীথি-শায়লা ভুলে সে বাড়িতে এসেছে। ঢাকা শহরের গল্প ঢাকায় ফেলে এসেছে। এখানে আফসানা।

বীথিকে ট্রেনে তুলে দিতে রেল স্টেশনে গিয়েছিল কমল। তার আগের রাতে কমলের এক বারান্দা, সংযুক্ত কিচেন-বাথরুমের রুমে সারারাত কাটিয়েছে দুজন। বীথি বারবিকিউ বানিয়েছিল। তারপর সারারাত বিছানায় দুজন সঘন নিঃশ্বাসে বুকেপিঠে মিশে হিম হয়েছিল। দীর্ঘ ও উষ্ণ জোয়ারের পর দেহ কী হিম হয়! পাশে পাপড়ি ছড়িয়ে শুয়ে থাকা বীথিকে চমত্কার বারবিকিউ মনে হয়েছিল কমলের।

পরদিন ভোরে ট্রেনে তুলে দেওয়ার সময় বীথির চোখে জল দেখে কমল ঘুরে দাঁড়ায়, রিকশা খোঁজে। খুব তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে তাকে, শায়লা ফোন করতে পারে। শায়লার ডাক আসবে কখন! শায়লা একটি বাদামি শালিক।

কথাটি ভাবতে ভাবতে বারবিকিউয়ের পোড়া গন্ধ নাকে লাগে তার। ভোরের দুই-এক ফোঁটা চোখের জল কমলের তেতো তেতো লাগে। শালিকের কিচিরমিচির নিয়ে আসে শায়লা। তার আনন্দ আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল সে।

শায়লা ডাকেনি সেদিন। ফোন করেছিল কমল। ওপাশ থেকে শায়লা ফোন কেটে দিয়েছিল। একবার নয় তিনবার। সারাদিন অপেক্ষার পর এক রুমের ভাড়া বাড়িতে ফিরেছিল কমল। এখন মনে হলো শায়লা হারিয়ে গেছে। শুধু ফোন নয়, যোগাযোগের তার কেটে দিয়েছে। বীথিও কী একদিন তার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে! শায়লার মতো! সম্পর্কের সুতোর কথা ভাবেনি কমল। সে ঘুড়ি চেনে।

লাল-নীল ঘুড়ি। সুতো ও লাটাই নিয়ে ভাবেনি। বিহ্বল কমলের মুখ থেকে বেরিয়ে যায় একটি শব্দ, লাটাই।

লাটাই! লাটাই আবার কোথায়? নে ধর এটা। আফসানার কথায় শীতনিদ্রা থেকে জেগে ওঠে কমল। কোকের ক্যান আর চিপসের প্যাকেট হাতে ফিরে এসেছে আফসানা। কখন উঠে গেছে, ফিরে এসেছে আফসানা, কমল টের পায়নি।

আরে ধর না, নদীর পারে বকধার্মিক হয়ে বসে আছিস কেন!

কমল কোকের ক্যান হাতে নেয়। আফসানা এখনো তুই তুই করে কথা বলছে!

কমলের পাশে বসে আফসানা, চিপসের টুকরো মুখে পুরে বলে, ঢাকায় কয়জন আছে তোর, এক ডজন! নাকি তারও বেশি! এই হারামি বল।

চমকে ওঠে কমল। হারামি! আফসানা তার চিন্তাও পড়তে শুরু করেছে!

কয়েক মুহূর্ত নিষ্ঠুর নীরবতায় কাটল। নিজেকে গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল আফসানা। বলল, এবার যাই। চিপসের প্যাকেটটি মুচড়ে ফেলে দিল পাশের ঝোঁপে।

কোকের ক্যান হাতে বসেছিল কমল, মনে হলো চিপসের প্যাকেটের মতোই তাকে মুচড়ে ফেলে দিল আফসানা অন্ধকারে ঝোঁপের ভেতর।

মুচড়ে যাওয়া কমল কাঠের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল, একটা রিকশা ডেকে দেই?

কমলের কাতরতা উপেক্ষা করে আফসানা বলল, বিছুটিলতা তোর ভালো লাগবে কেন? বিছুটিলতা কেউ ভালোবাসে না।

হনহন করে হাঁটছিল আফসানা। তার পেছনে কমল চিত্কার করে কোনোরকমে বলতে পারল, আমার বিছুটিলতাই চাই। আমার কষ্ট হবে না। আমি বিছুটিলতা ভালোবাসি। বিছুটিলতা বিছুটিলতা... ও আফসানা...

আশপাশে লোকজন। তাদের কেউ কেউ ফিরে তাকাল। একজন রিকশাঅলা, সেও পাশ কেটে যাওয়ার সময় পান-খাওয়া দাঁত বার করে হাসল। কমলের নজর এড়ায়নি।

নজর ফিরিয়ে যখন সে সামনে তাকাল, ততক্ষণে আফসানা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে।

 

দুই.

‘আমার কথাটি ফুরালো। নটে গাছটি মুড়ালো’ —কথা দুটি জুড়ে দিয়ে গল্পটি লিখে এনেছিল অনিকেত। অনিকেত আমার বন্ধু। প্রায়ই গল্প লেখে। আমাকে শোনায়।

সে এসেই আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল লেখাটি। পড়ে ফেললাম। অবাকও হলাম। বললাম, ভালোই তো হচ্ছিল কিন্তু...

কিন্ত-টিন্তু নেই, হাতের মোড়ক খোলায় ব্যস্ত অনিকেত আমার মুখের দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিল। তার চোখেমুখে বিরক্তি। মোড়কটি হাত দিয়ে খুলতে না পেরে তাতে দাঁত বসালো অনিকেত।

না মানে, আমি বলছিলাম গল্পটি তো ভালোই চলছিল হঠাত্ নটে গাছটি মুড়িয়ে দিলি কেন?

দিলাম। ছোটগল্প। আরো ছোট, মানে অণুগল্প। ওখানেই শেষ।

অণুগল্প, ছোটগল্প নিয়ে অনিকেতের সাথে তর্কে যাওয়ার সাহস আমার নেই। অনিকেত হাতের মোড়কটি খুলে ফেলেছে। কী আছে ভেতরে, দেখতে মুখ বাড়াই। অনিকেতের মুখে চওড়া হাসি। মোড়কটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

দেখ এতো বড়ো মোড়কের মধ্যে কী জিনিস!

দেখি মোড়কের পেটে আরেকটি শোলার বাক্স। তাতে হাতেগোনা কয়েকটি বিস্কুট। সতর্ক হই। বিস্কুট বলা যাবে না। অনিকেত ব্রিটিশ ইংরেজি পছন্দ করে না। গুগলের যুগে আমেরিকান ইংলিশ তার ফেভারিট। ভয়ে ভয়ে বলি, কুকিজ।

কুকিজ! অনিকেত চোখ বড়ো করে, ভয় পাই যদি খেপে ওঠে! আত্মরক্ষার সুরে বলি,

বিস্কুট বলিনি তো কুকিজ বলেছি।

এবার শব্দ করে হেসে ওঠে অনিকেত। ভাগ্যিস আমি একটি ঘুলঘুলি বিহীন ঘরে বাস করি। সেখানে কোনো চড়ুই পাখির বাসা নেই। থাকলে সে উড়াল দিত।

অনিকেতের হাসি থামলে একটা কুকিজ সে নিজের মুখে পুরল। চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তর দিল, এটা বিস্কুটও নয় কুকিজও নয়।

তা হলে কী! আমি অবাক হই।

এটা কর্পোরেট খাদ্য।

কর্পোরেট খাদ্য! আমি বোঝার চেষ্টা করি।

হ্যাঁ, এই কর্পোরেট কালচারের যুগে এটাও কর্পোরেট ভালোবাসা! অনিকেতের কণ্ঠ উদাস।

কর্পোরেট ভালোবাসা! আমি অনিকেতের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি।

হ্যাঁ, যে গল্পটা লিখেছি তার মতো। ছোটগল্প নয়।

তাহলে?

অণুগল্প, অনিকেতের ছোট উত্তর।