মিল্টন বিশ্বাস
‘মিয়ানমার : আরাকান রোহিঙ্গা সমস্যা’ (২০১৯) বইটি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মোঃ শামসুদ্দীন রচিত একটি ইতিহাসভিত্তিক বই। মিয়ানমার আরাকান ও রোহিঙ্গা সমস্যা বইটি ছাড়াও তিনি আরো অনেক বই লিখেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘কুর্দিস্তানের দিনগুলো’, ‘আইভরি কোস্ট’, ‘সাউথ সুদান’।
এ বইটিতে মিয়ানমারের আরাকান রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রোহিঙ্গা জীবনব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ইতিহাস, ভাষা থাকা সত্ত্বেও তারা দেশের ঘরছাড়া যাযাবর জাতিতে পরিণত হয়েছে। রাজ্য ছেড়ে, দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও বাংলাদেশে অবস্থান করছে শুধু প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য। তাদেরই কথা বলতে গিয়ে লেখক তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ-রাষ্ট্র, দুঃখ-দুর্দশার চিত্র বর্ণনা করেছেন। সেইসঙ্গে বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন। এ বইয়ের পনেরোটি প্রবন্ধে তাদেরই কথা বলতে গিয়ে লেখক তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, এবং একটি কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে সেসব চিত্র তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন মিয়ানমার তথা আরাকান রাজ্যের মুসলিমদের সাম্প্রতিক অবস্থা।
প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও আরাকানের ইতিহাস এবং এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যা স্থান পেয়েছে বইটিতে। এ বইটি আরাকান রাজ্য মিয়ানমার এবং তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক বিষয়গুলোর ধারণা দেয়। রোহিঙ্গারা এখন তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে বাংলাদেশ ও ভারতের রিফিউজি হিসেবে বসবাস করছে বিভিন্ন সমস্যাকে সঙ্গী করে। এ গ্রন্থে লেখক যে প্রবন্ধগুলো যোগ করেছেন তার অন্যতম কিছু প্রবন্ধ হলো—‘মিয়ানমারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’, ‘আরাকান রাজ্যের ইতিহাস’, ‘রোহিঙ্গাদের ইতিহাস’, ‘সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সমস্যা’ ও লেখকের ‘মিয়ানমার ভ্রমণ’।
মিয়ানমারের একটি অঞ্চল রাখাইন বা আরাকান যা বাংলাদেশের প্রাচীন জেলা চট্টগ্রামের সঙ্গে যুগ যুগ ধরে সম্পৃক্ত। যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে তাদের সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের আত্মার সম্পর্ক। যখনই মিয়ানমারের সমস্যা হয়েছে তখনই তারা বাংলাদেশে এসেছে এবং আশ্রয় পেয়েছে বন্ধুর মতো। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালায় তখনো বাংলাদেশে ৭ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে চার গুণ বড়ো এদেশের লোকসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে তিন ভাগ কম, তবুও রোহিঙ্গাদের পরজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে নির্যাতন করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। লেখক রোহিঙ্গাদের বর্তমান সমস্যা, তার কারণ এবং প্রতিকার তুলে ধরেছেন।
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বার বার মিয়ানমারে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীদের সঙ্গে সরকারের গৃহযুদ্ধ হয়। তারই সূত্র ধরে ২০১৭ সালে আবারও সৃষ্টি হয় সেই সংঘাত এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান রাজ্যের মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। তাদের নির্যাতন এত ভয়াবহ ছিল যে তা সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চল দিয়ে প্রায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা প্রাণে বাঁচতে চলে আসে। জীবন বাঁচাতে তারা বিভিন্ন রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল এবং সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় জীবন বেঁচে আছে সেখানকার মানুষের।
‘সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন দেশের সংস্থার তত্পরতা উঠে এসেছে। মিয়ানমার আর্মি রোহিঙ্গাদের গুলি করে হত্যা করে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে, নারীদের নির্যাতন করে তাদের বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করেছে। তাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র এমন ছিল যে নির্যাতনকারীরা রোহিঙ্গাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে নিত। তাদের এ সমস্যা সারা বিশ্বব্যাপী সুশীল সমাজের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজার জেলার টেকনাফ এবং উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের ক্যাম্পগুলোতে ত্রাণ বিতরণ ও বাসস্থান নির্মাণ, স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিকতার দরজা খুলে দেন।
তিনি শুধু ইতিহাস ও ভ্রমণকাহিনি লেখেন তা নয়, তিনি কবিতাতেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি এ বইতে সাবলীল ভাষা ব্যবহার করেছেন। গদ্য সুমধুর একটানা পড়ে যেতে ইচ্ছা করে।
