কন্যা মানুষ করে সত্ পাত্রস্থ করলে মেলে জান্নাত

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০৯

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

 

নর ও নারী মিলেই মানবজাতি। প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ (স) পুরুষশাসিত পৃথিবীতে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এক অনন্য বিপ্লব ঘটান। তার আবির্ভাবের আগে নারীকে শুধু ব্যবহার করা হতো ভোগের সামগ্রী হিসেবে, তাদের স্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না, তারা যেন ছিল আসবাবপত্রের মতো, তাদের মনে করা হতো পণ্যসামগ্রী, তারা তখন দিন গুজরান করত নিদারুণ নির্যাতনের মধ্যে, তারা হয়ে গিয়েছিল অস্থাবর সম্পত্তি এবং খেলনার বস্তু। নারী কেবলই পুরুষের সেবা করবে—এমনতরো ধারণা সবখানে শিকড় গেড়ে বসেছিল। সেবাদাসী প্রথা বিশ্ব সমাজজীবনে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, যে কারণে সৃষ্টি হয়েছিল থিওডোরা ও আম্রপালিদের মতো অসংখ্য সেবাদাসীর ও গণমনোরঞ্জক রমণীর। খোদ আরব দেশে তো কন্যাসন্তান হওয়াকে দুর্ভাগ্য মনে করা হতো। কন্যাসন্তান হলে তাকে জ্যান্ত কবর দিতেও কুণ্ঠাবোধ করত না আরবরা।

প্রিয়নবি (স) নারীকে এমন অমানবিক অবস্থান থেকে উদ্ধার করেন এবং তাদের কন্যা হিসেবে, বোন হিসেবে, মা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে সর্বোপরি মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিয়ে মূল্যায়ন করেন। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ভাষায় বিশ্ব মানবসভ্যতা নির্মাণে নারী ও পুরুষের যৌথ অবদানের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো (সুরা হুজুরাত :আয়াত ১৩।)

নারীর প্রথম পরিচয় সে কন্যা। কিন্তু কন্যা হিসেবে তার যে আদর-কদর, তা প্রিয়নবির আবির্ভাবের আগে ছিল না। কন্যাসন্তান জন্ম নিলে পিতামাতার মুখ কালো হয়ে যেত। এ অবস্থার কথা উল্লেখ করে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় দুঃখে মন ভার করে ফেলে। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার সংবাদ শুনে অপমানে সে লোকসমাজ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখত। কন্যাশিশুকে মাটিতে পুঁতে ফেলত তারা। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত নেয় তা কতই না নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত। (সুরা নহল :আয়াত ৫৮-৫৯)।

এই আয়াতে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করার কারণে অসন্তুষ্ট হওয়াকে হারাম করা হয়েছে। এতে এটাও প্রমাণিত হয়, কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে খুশি হওয়া উচিত। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে :যে স্ত্রীলোকের গর্ভ থেকে প্রথম কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে ভাগ্যবতী নারী। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। (সুরা শোয়ারা :৪৯।) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির (রহ) লেখেন, এখানে আল্লাহ প্রথম কন্যাসন্তানের কথা বলেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, যে দম্পতির প্রথম সন্তান কন্যা হবে, ঐ দম্পতির ওপর আল্লাহ তায়ালা রহমত-বরকত অঝোরধারায় বর্ষণ করেন।

রাসুল (স) একদিন সাহাবায়ে কেরামদের বললেন, যে ব্যক্তি কন্যা বা বোনকে লালন-পালন করে, তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে এবং তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করে, তারপর বয়স হলে সত্ পাত্র দেখে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে, জেনে রেখো, এমন ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (মিশকাত শরিফ।) অন্য একটি হাদিসে আছে, কারো যদি কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হয় আর তাকে যদি সে মেরে না ফেলে, তাকে যদি অপমানিত না করে এবং তাকে উপেক্ষা করে পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের যে দরজা ইচ্ছা সেই দরজা দিয়েই প্রবেশ করার সুবর্ণ সুযোগ দেবেন। (আবু দাউদ।) এভাবে শুধু কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ ও প্রতিপালনেরই অনেক মর্যাদা রয়েছে কোরআন-হাদিসে।

লেখক :মুফাসিসরে কুরআন ও চেয়ারম্যান,

বাংলাদেশ মুফাসিসর সোসাইটি

 

 

০