রেজাউল করিম খোকন
দেশে দ্রুতহারে কমছে ফসলি জমির পরিমাণ, যা অচিরেই অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। গত এক দশকে আগের তুলনায় দ্রুতহারে কমেছে ফসলি জমির পরিমাণ। এটাকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড়ো একটি হুমকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত এক দশকে প্রতি বছরে দেশে ফসলি জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর করে কমেছে, অথচ তার আগের তিন দশকে প্রতি বছর ফসলি জমি কমেছে ১৩ হাজার ৪১২ হেক্টর। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি, বেসরকারি নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রতিদিনই কমেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, দিনে ২ হাজার বিঘা জমি কৃষি থেকে অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।
আমাদের অর্থনীতিতে নানা পালাবদল ঘটেছে গত কয়েক দশকে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দাপট আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এখন শিল্প ও সেবাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি নতুন ঠিকানা খুঁজছে। কিন্তু দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিজমির ব্যবস্থা না করে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতি টেকসই হবে না। এটা সবাইকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
বর্তমানে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির অনুসরণের কারণে খাদ্য উত্পাদন আগের তুলনায় বেড়েছে বটে। বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো খাদ্য সংকট নেই। তবে এ অবস্থা একটানা দীর্ঘদিন বজায় থাকবে বলে মনে হয় না। ক্রমাগত কৃষিজমি ব্যবহারের ফলে এক সময় জমির উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়, একথা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। উত্পাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার পর আমাদের কৃষি উত্পাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এটা সত্যি যে জিডিপিতে সার্বিক কৃষি খাতের অবদান আগের তুলনায় কমে গেছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকে জিডিপির চার ভাগের তিন ভাগ আসত কৃষি খাত থেকে এখন তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমে গেলেও এখনো কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকাণ্ড ও জীবনীশক্তি-এটা না মেনে উপায় নেই। তাছাড়া পরোক্ষভাবেও জিডিপিতে কৃষির পরোক্ষ অবদানের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। বিশেষ করে বৃহত্ সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিপণন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন, সংরক্ষণও যোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের রয়েছে মূল্যবান অবদান।
স্বাধীনতার প্রথম দশকে দেশের মোট জনশক্তির ৭৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যানব্যুরোর ২০১৮ সালের তথ্য মোতাবেক কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ৪০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এলেও স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমশক্তির সংখ্যা সাকল্যে কমেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত কৃষি শুমারি ২০১৯ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট পরিবারের ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ গ্রামে, ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ শহরে বাস করে। এ থেকে বোঝা যায়, কৃষি আমাদের জীবন ও অর্থনীতিতে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা মানে জমির ওপর নির্ভরশীলতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য, দেশের জনসংখ্যা যখন বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন হ্রাস পাচ্ছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি খাতের তুলনায় জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান দ্বিগুণেরও বেশি। শিল্পায়নের মাধ্যমে আমরা পাচ্ছি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য উপকরণগুলো। তবে সেই সঙ্গে এটাও ঠিক যে, কৃষি খাত আমাদের মৌলিক চাহিদা খাদ্যের জোগান দেয়। কৃষক ও কৃষি খাতের অবদানে আজ আমরা আমাদের প্রধান খাদ্য চাল, শাকসবজি এবং আমিষের প্রধান উত্স মাছে স্বনির্ভরতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছি। মাছ ও মত্স্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। আমরা যেসব খাদ্যদ্রব্য—যেমন, গম, মাংস, ডাল, ভোজ্য তেল, দুধ, ফলমূল, মসলা চাহিদা মোতাবেক জোগান দিতে পারছি না। সেসব পণ্য অধিক পরিমাণে উত্পাদনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কৃষক ও সরকার। শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহে ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে মূল্যবান অবদান রেখে আসছে কৃষি খাত।
কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পুরোনো প্রচলিত কৃষি সরঞ্জামের বদলে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ কয়েকগুণ উত্পাদন বাড়িয়ে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির যে গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার পেছনে রয়েছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের আশীর্বাদ। এক সময়ে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার কিংবা ধান মাড়াইয়ের যন্ত্রের ব্যবহারের কথা ভাবতে পারতো না এ দেশের কৃষক। হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট কিছু খামার কিংবা পাইলট কৃষি প্রকল্পে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু আজকাল নিভৃত গ্রামেও কৃষিজমিতে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল উপলদ্ধি করে এখন বেশির ভাগ কৃষক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশে এখনো কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণে ব্র্যান্ডিং ততটা ব্যাপকতা লাভ করেনি। তবে কৃষি পণ্যের ব্র্যান্ডিং বদলে দিতে পারে অর্থনীতির চাকা। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণে জোরালো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কৃষক তার উত্পাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে প্রতিবাদ হিসেবে সেই কৃষি পণ্যটি ক্ষোভে ধ্বংস করেছেন—এমন দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি। আবার কেউ কেউ চাষাবাদ বন্ধ করে দিচ্ছেন। আমাদের কৃষক তার উত্পাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না-তেমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আমাদের বাংলাদেশে উত্পাদিত অনেক কৃষি পণ্য, শাকসবজি, ফলমূল আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ চাহিদাসম্পন্ন। তেমন কৃষি পণ্যের ব্র্যান্ডিং করার মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন সম্ভব। বাংলাদেশে কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসা কর্পোরেট হাউজগুলোকে কৃষকের কল্যাণ, দেশের কল্যাণ এবং প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ এবং স্বার্থকে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আজ এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে কৃষিতে আমাদের অর্জন যতটা তার অনেকটাই মৌলিক। আমাদের দারিদ্র্য বিমোচনে যে সাফল্য এসেছে, তা কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমেই এসেছে। কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বারোপ কিংবা অন্য যে কোনোভাবেই হোক না কেন তা দারিদ্র্য দূরীকরণে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। কৃষিক্ষেত্রে যতটা অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে তা আরো এগিয়ে নিতে হলে কৃষি প্রযুক্তিতে আরো নতুন এবং অধিক উত্পাদন সক্ষম কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে সন্দেহ নেই। এটা অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে।
