শফিকুর রহমান রয়েল
বৈষম্য বা অসমতা যা-ই বলি না কেন, এটি সারা বিশ্বেই বিদ্যমান। কিন্তু নতুন তথ্য হচ্ছে, অসমতার মাত্রা সম্পর্কে সবাই যা জানে, প্রকৃত মাত্রা তার চেয়ে অনেক বেশি। এককথায় যা ভয়াবহ। নতুন এক বিশ্লেষণে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। অসমতার সরকারি হিসাবে শুধু সেসব অর্থই বিবেচনায় আনা হয়, যার প্রতি কর আদায়কারীদের নজর পড়ে। সাম্প্রতিক এক গবেষণার পর এসব তথ্য জানিয়েছেন পৃথিবীর তিন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যালেট স্টাডসেটার, নিলস জোহানসেন ও গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান। তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞে পানামা ও সুইজারল্যান্ডের কাছে থাকা অত্যন্ত গোপনীয় দলিলের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। যেগুলো জানার পর বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। আর এর মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে কর ফাঁকির বিস্ময়কর সব তথ্য উঠে এসেছে, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন সারা বিশ্বের বাঘা বাঘা সব সম্পদশালী লোক।
অত্যন্ত মেধাবী এই তিন অর্থনীতিবিদ অর্থসম্পদ-বিষয়ক ফাঁস হয়ে যাওয়া তথ্যাবলিকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তিদের প্রকৃত অর্থের মূল্যায়নে ব্যবহার করেছেন। সর্বোচ্চ ধনীদের তালিকার নিচের দিকে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে শীর্ষদের সম্ভাব্য ব্যবধানও বেরিয়ে এসেছে। এখন পর্যন্ত সম্পদ মূল্যায়নে প্রায় সব ক্ষেত্রে এলোপাতাড়ি নিরীক্ষার ওপর নির্ভর করা হয়েছে, যা সম্পদের গোপন পাহাড় থাকলেও সে বিষয়ে কোনো তথ্য তুলে ধরতে পারে না। গরিবেরা তাদের কাছে সব অর্থ ফেরত দিলেও বৈশ্বিক অসমতার পরিমাপে তেমন একটা হেরফের হবে না, কিন্তু ধনীরা তাদের কাছে পাওনা কর মিটিয়ে দিলে বিশ্বের চেহারায় পরিবর্তন আসবে আমূল, যা সহজেই অনুমেয়। বস্তুত অর্থের ব্যাপারে গরিবদের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি প্রতারণার আশ্রয় নেয় ধনীরা।
বিখ্যাত তিন অর্থনীতিবিদ একত্রে গবেষণা চালিয়েছেন তিন সেট তথ্য নিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে ফাঁস হয়ে যাওয়া পানামা পেপার্স, যে আইনি প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর ফাঁকি দিতে সাহায্য করেছিল। সুইস লিকস, যেটি জানিয়ে দিয়েছিল হংকং সাংহাই ব্যাংক করপোরেশনের সুইস ভর্তুকির কথা। তৃতীয়টি হচ্ছে স্ক্যানডেনিভিয়ান ট্যাক্স, যেটি ঐ অঞ্চলের নাগরিকদের অস্বাভাবিক রকমের আয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিল। তিন অর্থনীতিবিদ ফাঁস হয়ে যাওয়া তথ্যাদিকে সমন্বয় করে কর ফাঁকির ধরন ও পরিধি সম্পর্কে সত্যিকারের চিত্রটা উপস্থাপন করেছে বিশ্ববাসীর সামনে, যার ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক অসমতাকে ধারণা বা অনুমিত হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদত্রয়ী খুঁজে বের করেছেন নরওেয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের সবচেয়ে সম্পদশালী ০.০১ শতাংশ লোক গড়ে তাদের কাছে পাওনা করের ৩০ শতাংশ এড়িয়ে যান বা ইচ্ছা করেই জমা দেন না। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো হয় যে এই সংখ্যা আবার তাদের জনগণের প্রদত্ত মোট করের প্রশ্নে মাত্র ৩ শতাংশ, যা কিনা একবারেই অবিশ্বাস্য এবং আসল তথ্য অনুধাবনের জন্য খুব একটা খাটাখাটনিরও প্রয়োজন পড়ে না।
সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে নরওয়ের কাছ থেকে। নরওয়েতে অতিধনীরা, অর্থাত্ সম্পদ পিরামিডের প্রশ্নে সবচেয়ে ওপরে থাকা ০.০১ শতাংশ লোক আগের ধারণার চেয়ে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বেশি ধনী। সম্পদের তথ্য লুকিয়ে রাখার প্রশ্নে তারা যে শুধুই সিদ্ধহস্ত তা নয়, সরকারও এ ব্যাপারে হাত বাড়িয়ে দেয় আন্তরিকতার সঙ্গে। এই ০.০১ শতাংশের হাতেই দেশের মোট সম্পদের ১০ শতাংশ বন্দি রয়েছে। আগে ধারণা ছিল এরা মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। গবেষণা করতে গিয়ে তিন অর্থনীতিবিদ আরো অনেক দেশ সম্পর্কেই বিস্তারিতভাবে অনেক তথ্য তুলে ধরেছেন। এমনও অনেক তথ্য দিয়েছেন, যেগুলোতে আয়কর জমা দেওয়ার প্রশ্নে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলাই নেই এবং কখনো ছিলই না। বিত্তশালীরা খুব ভালোভাবেই জানেন যে কর আদায়কারীদের সন্তুষ্ট করতে পারলেই কেল্লাফতে। বিশেষত আমাদের এই ভারত উপমহাদেশের আয়কর জমা দেওয়ার প্রশ্নে অনেক নেতিবাচক তথ্য দিয়েছেন। অস্বীকার করার জো নেই যে স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশগুলোতেও আয়কর বা কর ফাঁকি দেওয়া হয়, তবে তা অনেক উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে একবারেই নগণ্য।
আয়কর জমা দেওয়ার প্রশ্নে এশিয়ার কয়েকটি দেশ সম্পর্কে বেশ ভালো রিপোর্ট জমা দিলেও আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সব দেশ সম্পর্কেই তুলে ধরেছেন নেতিবাচক সব তথ্য। অবশ্য ঐ মহাদেশের অতিধনীদের যার যার সরকার বেশি খোঁচায়ও না আর এটিই তো স্বাভাবিক। আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশে দেশপ্রধানের মর্জি ছাড়া কারো পক্ষে অতিধনী থাকাটাস কল্পনারও অতীত। অর্থাত্, যারা ধনী হচ্ছে তারা রাষ্ট্রনায়কের সম্মতিতেই হচ্ছে। অবশ্য রাষ্ট্রনায়কেরা নিজেরাও অতি ধনী। অর্থসম্পদ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তারা মোটেও কার্পণ্য করেন না। কেননা, তারা জানেন যে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে আর যাই হোক দেশে থাকাটা অন্তত কঠিন হয়ে পড়বে। তখন পাঠানো অর্থ বা তা দিয়ে কেনা সম্পদই কেবল সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে অচেনা-অজানা পরিবেশে পথ দেখাবে। ঘনিষ্ঠজনেরাও যে তখন ভোল পালটে শামিল হবে ঘোরবিরোধীদের কাতারে!
ফরেন পলিসি অনুসরণে
