অনাথ স্কুল এখন ভূতের বাড়ি!

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১৪

্

নির্জন  উঁচু পাহাড়। চারদিকে বন-জঙ্গল। দালান-কোটাগুলোও গাছ-গাছালি, লতা-পাতায় ঢেকে গেছে। টিন শেডের আধাপাকা ঘরগুলোর টিনের ছাউনি নেই। নেই দরজা-জানালা। ছাদ করা বিশালায়তনের দুটি ভবনেরও একই অবস্থা। কাঠের দরজা, জানালা ঘুণে খেয়ে ধসে গেছে। কলাপসিবল গেটের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেই গা শিউরে ওঠে। যেন গা ছমছমে ভূতুরে ভয়। ভবনের ভেতরের বিভিন্ন কক্ষের কোনোটিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্কুলের বেঞ্চ। কোনো কক্ষে পড়ার বক্স টেবিল ও চেয়ার, আবার কোনোটিতে স্টিলের তৈরি ঘুমানোর দোতলা খাট। মাকরশা আর নানা পোকা-মাকড় বাসা বেঁধেছে প্রতিটি কক্ষে। দেয়ালগুলো লতা-পাতায় ঢাকা। পলেস্তরাল খসে পড়ছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। সবকিছু মিলিয়ে বলাা যায়, এই যেন এক ভূতের আস্তানা। ভূতের বাড়ি। কিন্তু বাস্তবে এটি এতিম-অনাথদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা পরিত্যক্ত আবাসিক স্কুল। খাগড়াছড়ির রামগড়ের তৈছালাপাড়া এলাকায় এর অবস্থান। স্থানীয় এতিম ও অনাথ বালক-বালিকাদের ফ্রি লেখাপড়ার সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই প্রায় ১৩-১৪ বছর আগে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এতিম-অনাথ আবাসিক স্কুলটি। ক্লাস রুম, বেঞ্চ, ব্লাকবোর্ড ছাড়াও বালক-বালিকাদের জন্য আলাদা আলাদা দুটি বিশাল সুদৃশ্য হোস্টেল ভবন। যেখানে রয়েছে ৫টি করে হল রুম, একটি ডাইনিং রুম, অফিস রুম, কেয়ারটেকার রুম ও আধুনিকমানের ওয়াশ রুম। থাকার হল রুমে রয়েছে স্টিলের তৈরি দোতলা খাট, লেপ, বেড সিট, বালিশ, মশারি, রিডিং বক্স টেবিল, চেয়ার। ডাইনিং রুমের যাবতীয় ফার্নিচার, ক্রোকারিজ সামগ্রী, কিচেনের হাঁড়ি-পাতিলসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রই রয়েছে। প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক, সহকারি শিক্ষক ও কর্মচারীর জন্য পৃথক পৃথক ডরমেনটরিও আছে। আছে নিজস্ব বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও ওয়াটার সাপ্লাই। ১২ একর জায়গার ওপর নির্মিত প্রতিষ্ঠানটি পাকা সীমানা প্রাচীরে সংরক্ষিত। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, ছাত্রছাত্রী ভর্তির সব আয়োজনও সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তীরে এসে তরী ডোবার মতোই ভাগ্যবরণ করতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় সব প্রস্তুতি থাকার পরও চালু হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৬ সালে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও গাফিলতিতে সরকারের কোটি কোটি টাকার এ সম্পদ অনাদর-অবহেলায় পরিত্যক্ত থেকে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য ক্রয় করা লেপ, তোষক, বালিশ, বিছানার চাদর, মশারি, ডাইনিং ও কিচেনের তৈজসপত্র, বিভিন্ন ভবনের বৈদ্যুতিক পাখা, লাইট, পানির ট্যাংকসহ মূল্যবান বিভিন্ন সামগ্রী রুমে-রুমে স্তুপ করে রাখা হয়েছে। এসব মূল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একজন কেয়ারটেকার নিয়োজিত থাকলেও তিনি নিধিরাম সর্দারের মতো। তিনি পান না নিয়মিত বেতন।

পার্বত্য এলাকার এতিম, অনাথ বালক-বালিকাদের শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড তিন পার্বত্য জেলায় ৩টি আবাসিক স্কুল নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। এ ৩টি আবাসিক স্কুল প্রকল্পের জন্য ৫ কোটি টাকা করে মোট ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। ২০০৫ সালে নির্মাণের পর রাঙ্গামাটির রাজস্থলী ও বান্দরবানের রুমা উপজেলায় এ আবাসিক স্কুল চালু করা হলেও রামগড়ের স্কুলটি চালু হয়নি। ২০০৭ সালে রামগড়ের স্কুলের জন্য মাস্টারোলে ৪ জন গার্ড, ২জন টেবিল বয়, ২ জন আয়া, পিয়ন ও একজন ঝাড়ুদার নিয়োগ এবং ২০০৮ সালে ৬০ জন এতিম, অনাথ বালক ও ৬০ জন বালিকা ভর্তির জন্য দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্কুলটি আর চালু করা হয়নি। নিয়োগের ১ বছর পর কর্মচারীদের মধ্যে ৪ জনের নিয়োগ বাতিল, ৩ জনকে অন্য প্রকল্পের অধীনে বদলি এবং অপর ২ জনকে খাগড়াছড়ি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ে নিয়ে যায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ।