মণিপুরী নারী বিদ্রোহের ইতিকথা

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১৫

মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান দুটি অনুষ্ঠান হলো ‘মহারাস উত্সব’ ও ‘নুপিলান দিবস’। প্রতিবছর দামোদর মাস খ্যাত কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে ‘মহারাস উত্সব’ ও ১২ ডিসেম্বর ‘নুপীলান দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। মণিপুরীদের দুটি প্রধান অনুষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম ‘নুপিলান’ বা নারী বিদ্রোহ দিবস ১২ ডিসেম্বর সিলেট বিভাগের সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার মণিপুরী পাড়াগুলোতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে। প্রতিবছরের মতো এবারো মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রামনগরের মণিপুরী পাড়ায় সিলেট বিভাগের সর্ববৃহত্ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নুপিলান দিবসটি হবে ৮০তম।

 

 

নুপিলান দিবস কী?

নুপিলান বা মণিপুরী নারী বিদ্রোহ দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে মণিপুরী তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রথম নারী আন্দোলন সংগঠিত হয় ১৯০৪ সালে। ওই বছরের ১৫ মার্চ অ্যাসিসটেন্ট পলিটিক্যাল এজেন্টের বাংলোতে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। একই বছরের ৪ আগস্ট পুনরায় রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে ভস্মিভূত হয় ওই একই বাংলো। এ অবস্থায় পলিটিক্যাল এজেন্ট বাংলোর আশেপাশের ৪টি মণিপুরী গ্রামের পুরুষ প্রধানকে তাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে বাংলোটি পুনঃনির্মাণ করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়। এছাড়া মণিপুরী গ্রামগুলোর প্রধানদের বাধ্যতামূলক কায়িক শ্রম করতে হবে এমন নির্দেশ জারি করা হয়। মণিপুরী সমাজের প্রচলিত প্রথা হলো ব্রাহ্মণ এবং রাজবংশের লোকেরা কোনো কায়িক শ্রমে অংশ নেবে না। কিন্তু ব্রিটিশ কর্মকর্তার আদেশে মণিপুরী সমাজের পুরুষ প্রধানদের কায়িক শ্রমে বাধ্য করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ফলে মণিপুরী সমাজে এ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের দাবানল। ওই বছরের ২ অক্টোবর মণিপুরী নারীরা প্রথমে আন্দোলনে নামেন। মণিপুরী মহিলা নেত্রী শামুহাওবী দেবী, মনিহাও মা প্রমুখের নেতৃত্বে নারীরা মিছিল বের করে এ অন্যায় আদেশ প্রত্যাহারে ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি জানান। পরে মণিপুরী নারীদের যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন মেগাজিত্ সিংহ, কালা সিংহ, চাওবা সিংহ, মুতুম সিংহ, চমু সিংহ প্রমুখ মণিপুরী পুরুষ। এ আন্দোলন করার কারণে ব্রিটিশ সরকার ৭ নারী ও ৫ পুরুষকে বন্দি করে। ফলে আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পিছুহটতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। বাধ্যতামূলক কায়িক শ্রম থেকে ব্রাহ্মণ ও রাজবংশের লোকদের বাদ দেওয়া হয়। মণিপুরী নারীরা সম্মিলিতভাবে আন্দোলন পরিচালনা করে প্রথম নারী বিজয় লাভ করেন।

এর ঠিক ৩৫ বছর পর সংগঠিত হয় দ্বিতীয় নারী বিদ্রোহ। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের মণিপুরে যখন চরম খাদ্যাভাব তখন তত্কালীন শাসকরা যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য মণিপুর থেকে ধান ও চাল পাঠানো শুরু করে। এ অবস্থায় মণিপুর রাজ্যে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় চরমভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মণিপুরী প্রজারা। সে প্রেক্ষাপটে ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নারী সমাবেশ ও দরবার ঘেরাও কর্মসূচি। মণিপুরী নারী সমাজ শ্লোগানে-শ্লোগানে দরবার হলের উন্মুক্ত মাঠে অবস্থান নেন। সেখানে সমাবেশ করেন তারা। পরে মণিপুরী নারীরা দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যান দরবার অভিমুখে এবং দরবার ঘেরাও করে তাদের দাবি দরবার প্রেসিডেন্টের কাছে পেশ করেন। মণিপুরী নারীরা তাদের দাবিনামায় মণিপুর থেকে ধান-চাল পাঠানো বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় স্টেট দরবারের প্রেসিডেন্ট মি টি এ সার্প আন্দোলনকারী নারীদের জানান, মণিপুরের মহারাজ স্যার চূড়াচান্দ সিংহের অনুমোদন ছাড়া তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না। সে সময়ে মণিপুরের মহারাজ স্যার চূড়াচান্দ সিংহ নবদ্বীপ ধামে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু মণিপুরী নারীরা এ অজুহাত মেনে নিতে রাজি না হয়ে জোরপূর্বক স্টেট দরবারের প্রেসিডেন্ট মি টি এ সার্পকে ধরে নিয়ে যায় টেলিগ্রাফ অফিসে। সেখান থেকে মি সার্প ধান-চাল বাইরে না পাঠানোর অনুমোদন চেয়ে মহারাজ স্যার চূড়াচান্দ সিংহের কাছে রিটার্ন টেলিগ্রাম পাঠান। টেলিগ্রাম পাঠানোর পর মি সার্প তার বাসভবনে ফিরে যেতে উদ্যত হলে মণিপুরী নারীরা টেলিগ্রামের জবাব না আসা পর্যন্ত তাকে কোথাও যেতে দিতে রাজি নয় বলে জানায়। তারা সার্পকে টেলিগ্রাফ অফিসে আটকে রাখে। দ্রুত খবরটি ছড়িয়ে পড়লে তাকে মণিপুরী নারীদের হাত থেকে উদ্ধারে ৪র্থ আসাম রাইফেলসের কমান্ডেন্ট মেজর বুলফিল্ডের নেতৃত্বে এক প্লাটুন সৈন্য টেলিগ্রাফ অফিসে এসে প্রচেষ্টা চালায়। মণিপুরী নারীরাও তাকে ছাড়তে রাজি নয়। এ অবস্থায় শুরু হয় সংঘাত। ২ দিন ধরে অভুক্ত মণিপুরী নারীরা ‘তেম’ (কাপড় বুননের সময় ব্যবহূত কাঠের তৈরি একদিক ঈষত্ ধারালো এক ধরনের দণ্ড) হাতে সৈন্যদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালায়। সৈন্যদের বন্দুকের আঘাতে এ স্থানে মাণপুরী নারীদের অনেকেই আহত হন। এদের অনেককেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। টেলিগ্রাফ অফিস থেকে শীর্ষ মণিপুরী নারী নেত্রীদের ১০ জনকে বন্দি করা হয়। এ অবস্থায়ও সাহসী মণিপুরী নারীরা পিছুহটেনি। টেলিগ্রাফ অফিসে আটকে রাখেন মি. সার্পকে। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর মহারাজ স্যার চূড়াচান্দ সিংহের কাছ থেকে টেলিগ্রাম আসে। টেলিগ্রামে মহারাজ মণিপুর থেকে ধান-চাল অন্যত্র পাঠানো বন্ধ করার ঘোষণা প্রদান করেন। এরপর মি. সার্পকে মুক্তি দিয়ে আন্দোলনকারী মণিপুরী নারীরা নিজ নিজ বাসভবনে ফিরে যান। এ আন্দোলনে যেসব মণিপুরী নারী সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন তারা হলেন খোংনাং দেবী, তোঙ্গৌ দেবী, মুখী দেবী, কুমারী দেবী, অমুবী দেবী, লৈপাকলৈ দেবী, কাবী দেবী, ইবেমহল দেবী, রজনী দেবী, সানাতোম্বী দেবী, চাওবীতোন দেবী, অশংবী দেবী, তিংগোং দেবী, কবোকলৈ দেবী, পিশক দেবী প্রমুখ।

মণিপুরী নারীদের দ্বারা সংগঠিত দ্বিতীয় বিদ্রোহ বৃহত্ নারী বিদ্রোহ হওয়ায় এ দিবসটিকে মণিপুরী সমাজ ‘নারী বিদ্রোহ’ বা ‘নুপিলান দিবস’ হিসেবে প্রতিবছর পালন করে আসছে। প্রথম নারী বিদ্রোহ দিবসটিও মণিপুরীরা পালন করে। তবে তা বৃহত্ পরিসরে নয়। এদিনটি স্বল্প পরিসরে শুধু আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই পালিত হয়।